চৈতন্য অন্তর্ধান – পরমেশ গোস্বামী

চৈতন্যের অন্তর্ধানের চারশো বিরানব্বই বছর পরেও তাঁর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে অসংখ্য অনুমানের ভিতরে এখনও নানা ঘরানার সাতটি প্রবাদ কমবেশি টিকে আছে। একটি মৃত্যু, সাতটি প্রবাদ!

আরও আছে – মৃত্যুর স্থান-কাল নিয়েও প্রচুর মতভেদ। তবে মতভেদ যতই থাকুক, যতই অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত থাকুক, সাধারণ মানুষ কিন্তু সেগুলো মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি। একটি ব্যাপারে তাঁরা প্রায় নিশ্চিত যে চৈতন্যের মৃত্যু ঘটেছিল অস্বাভাবিকভাবে। স্বাভাবিক মৃত্যু হলে তাঁর মতো এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের কোথাও না কোথাও একটি সমাধিসৌধ থাকতই। শুধু তাঁরই নয়, অন্ত্য-পর্বে তাঁর অন্তরঙ্গ সঙ্গী ও বৈষ্ণব আন্দোলনের সুবিদিত ব্যক্তিত্ব স্বরূপ দামোদর এবং গধাধর পণ্ডিতেরও কোথাও কোনো সমাধিসৌধ নেই। মৃত্যুর পরে তাঁদের দেহাবশেষের কী পরিণতি হয়েছিল তা আজ অবধি কেউই নির্দিষ্টভাবে জানেন না।

উল্টে এমন সব নথি আছে যাতে দেখা যায় চৈতন্যের অন্তর্ধানের পর পুরীতে বেশ কিছু বৈষ্ণবের হঠাৎ ‘সর্পাঘাত’ জাতীয় অস্বাভাবিক কারণে মৃত্যু হয়, এবং, প্রাণভয়ে চৈতন্যপন্থীরা অনেকেই পুরী ত্যাগ করেন। চৈতন্য অন্তর্ধানের পর চৈতন্যের বিরুদ্ধবাদীরা এত প্রবল হয়েছিল যে পরবর্তী প্রায় পঞ্চাশ বছর বাংলা ও ওড়িশায় কীর্তনগানই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক সন্ত্রাস এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে এই পর্বটিকে ঐতিহাসিকগণ ওড়িশার অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলেও আখ্যা দেন। এইসব নিদর্শনে চৈতন্য অন্তর্ধান যে একটা বৃহৎ সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চৈতন্যের কৃষ্ণপ্রেম আজ অনেকের কাছেই তেমন কোনো বার্তা বয়ে আনে না। পঞ্চাশ বছর আগের নকশাল আন্দোলনও তেমনি। কিন্তু স্থান-কালের প্রেক্ষিতে শ্রেণীসংগ্রাম তত্ত্বে সেদিন নকশাল আন্দোলন তার ভিত্তি পেয়েছিল। শত-শত মেধাবী ছাত্র সেদিন ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে অনিশ্চয়তা, দুঃখ ও মৃত্যু বরণ করেছিল। তেমনি, স্থান-কালের প্রেক্ষিতে চৈতন্যের ভিত্তি কৃষ্ণপ্রেম। এই দুই আন্দোলনেরই মূল একটা চিরকালীন আবেদন। সেটা হল পুরনোর অস্বাস্থ্যকে ছেড়ে নতুনের স্বাস্থ্যকে লাভ করা। নকশাল আন্দোলন, চৈতন্য আন্দোলনে আছে পরিবর্তন সাধনার সেই চিরকালীন আবেদন। যা চিরকালীন তা সেকেলে হতে পারে না। চৈতন্যের আবেদনও তাই অনাধুনিক নয়।

চৈতন্য সম্বন্ধে আধুনিক মানুষের কৌতূহলের আর একটা দিক থাকতে পারে। জাতিভেদ আর হানাহানির যুগে, যখন মানুষের আদিম হিংস্র প্রবৃত্তির জয়জয়কার, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তার মোকাবিলায় চৈতন্য জাগাতে চেয়েছিলেন মানুষের আর এক আদিম বৃত্তিকে — প্রেমকে। যাকে বলে গোড়া ঘেঁষে কাজ। ইতিহাস জানে কতদূর সফল তিনি হতে পেরেছিলেন — জীবৎকালে এবং তার পরে। সেই সময়কার বৈরী সমাজ চৈতন্যের কাজকর্ম কীভাবে সামলাতে চেয়েছিল, তাঁর জীবন ও অন্তর্ধানের ইতিহাসে সে ইঙ্গিত রয়েছে। সেই সমাজের সঙ্গে আজকের সমাজের মিল যদি কেউ দেখতে পান, এবং তাকে বদলানোর আবেগ অনুভব করেন, সেই ইতিহাস সম্বন্ধে তাঁর কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক।

প্রসঙ্গত চৈতন্যজীবনের দিকে আর একবার ফিরে তাকানো যাক। চৈতন্য জন্মেছিলেন ১৪৮৬ খৃস্টাব্দে। সেই সময় বাংলা তথা ভারতবর্ষ হিংসা, বিদ্বেষ ও হানাহানিতে জর্জরিত ছিল। শোষণ ও লুণ্ঠন ছিল অবাধ। জাতিভেদ, সংস্কারাচ্ছন্নতা ছিল সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে। নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে হানাহানি লেগেই থাকত। এই বিষয়গুলি আজও রয়েছে, তবে সেদিন এর চেহারা ছিল সম্ভবত আরও বীভৎস। তার উপরে, তখন সাধারণ মানুষ ছিল অনেকটাই অসংগঠিত। এই সব ক’টি বিকার মূলত সস্কারাচ্ছন্নতা থেকেই জন্মায়। সেদিন চৈতন্যের প্রধান কাজ ছিল এই সংস্কারাচ্ছন্নতাকে নির্মূল করা।

চৈতন্য তাঁর নিজের সমস্ত লেখা একদিন গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, সেজন্য তাঁর স্বরচিত লেখা বিশেষ একটা পাওয়া যায় না। সামান্য যে-ক’টি শ্লোক এদিকওদিক পাওয়া গেছে তার একটিতে তিনি বলছেন-

“নাহং বিপ্রো ন চ নরপতির্নাপি বৈশ্যো ন শূদ্রো ।”

(আমি ব্রাহ্মণ নই, নই নরপতি কিংবা বৈশ্য, নই শূদ্র ।)

আর এক জায়গায় বলছেন,

“চণ্ডালহোপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরিভক্তি পরায়ণঃ”

(হরিভক্তি পরায়ণ চণ্ডালও দ্বিজশ্রেষ্ঠ বলে গণ্য ।)

আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে ব্রাহ্মণকুলজাত এক ধর্মীয় নেতার পক্ষে সংস্কার ভাঙার এমন উল্লসিত শ্লোক রচনার ঘটনা ঐতিহাসিক। কেননা, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়েও দেখা গেছে সর্বভারতীয় কোনো কংগ্রেস নেতা কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে সদলবলে আসছেন, সঙ্গে আনছেন ভৃত্যমণ্ডলী ছাড়াও পাঁচটা ব্রাহ্মণ যাতে শুদ্ধাহারের বিঘ্ন না ঘটে।

চৈতন্যের পুরীবাসের কালে ব্রাহ্মণসন্তান জগন্নাথদাস তাঁর কাছে দীক্ষা নিতে চাইলে তিনি বলরামদাসকে নির্দেশ দেন সেই দীক্ষা দেওয়ার জন্য। তাঁর নির্দেশ শিরোধার্য হয়েছিল। কিন্তু গুরু বলরামদাস ছিলেন শূদ্র। তবে, স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই আচরণকে রাজা প্রতাপরুদ্রের কুলগুরু কাশী মিশ্র ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে মনে করেছিলেন। চৈতন্যের আচরণে ব্রাহ্মণ সমাজের বিরক্তি কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখনীতে ধরা আছে,

এই ত সন্ন্যাসীর তেজ দেখি ব্রহ্ম-সম ।

শূদ্রে আলিঙ্গিয়া কেন করেন ক্রন্দন ।।

ব্রিটিশ আমলে কেন, আজও যেখানে অনেক উচ্চশিক্ষিত প্রবাসী ভারতীয় প্রচুর খরচা করে দেশ থেকে খাঁটি ব্রাহ্মণ নিয়ে গিয়ে পূজা করান, আমাদের দেশে যেখানে তথাকথিত রেনেশাঁসের যুগেও অনেক বৈপ্লবিক ধর্মনেতা ও সমাজনেতা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রথাসিদ্ধ সংস্কার মেনে চলতে বাধ্য হয়েছেন কমবেশি, সেখানে রঘুনাথদাসকে শালগ্রাম শিলাস্বরূপ গিরি গোবর্ধনের শিলাদান করে রঘুনাথকেই তার পূজার দায়িত্ব দিয়েছিলেন চৈতন্য। এই রঘুনাথদাসও ছিলেন শূদ্র। চৈতন্যের এই আচরণে রাজকুলগুরু কাশী মিশ্র চৈতন্যের উপর ক্রোধ প্রকাশ করেছিলেন।

তখনকার সমাজের মূলধারার সংস্কারগুলির অধিকাংশকেই চৈতন্য অমান্য করেছেন। এই না মানাটা ছিল না তত্ত্বগত। তাঁর ভক্তিতত্ত্বের মধ্যেই ছিল অভেদের হৃদয়াবেগ। চৈতন্যের এই আবেগপূর্ণ সাম্যবাদ সেদিন বাংলার স্মার্তসমাজকে রুষ্ট করেছিল, রুষ্ট করেছিল ওড়িশার স্মার্তসমাজকেও। এছাড়াও তেমন মানুষও আছেন যাঁরা স্মার্ত নন কিন্তু অন্যতর ভেদের উপর ভিত্তি করে সামাজিক প্রতিপত্তির অধিকারী। তাঁদেরও চৈতন্যের বাণীতে বিগলিত হওয়ার কথা নয় । চৈতন্য যখন বলেন,

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা

অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদাহরিঃ।

তখন যাঁরা ইতিমধ্যেই সামাজিক ক্ষমতা অর্জন করে বসে আছেন তাঁদের এই বাণীতে বিগলিত হওয়ার কিছু থাকে না। সেটা এইজন্যও আরো যে এসব কথা চৈতন্য তাত্ত্বিকভাবে বলেন নি, বলেছিলেন এক আন্দোলনের সক্রিয় নেতার অবস্থান থেকে। ফলে, তিনি যতই গুণের অধিকারী হোন, জীবন দিয়ে যা বলে চলেছেন তা নিরঙ্কুশ জনপ্রিয় না হতেই পারে, কার্যক্ষেত্রে হয়ও নি।

চৈতন্য ছিলেন সংবেদনশীল এক পুরুষ। বাল্য ও কৈশোরে তাঁর জীবনযাপনের চারি ধারে তিনি প্রথাসর্বস্ব ও স্থূল সমাজ দেখেছিলেন। তাঁর মন সেইসবকে ছাড়িয়ে এক প্রীতিপূর্ণ জীবনের সন্ধান করেছিল। রবীন্দ্রনাথ যেমন পুজো-আচ্চা থেকে দূরে থেকে নাচ-গান, অভিনয়, বৃক্ষরোপণ উৎসব, ঋতুবন্দনা, হল-কর্ষণ উৎসবের মধ্য দিয়ে জীবনযাপনের ছন্দ খুঁজেছিলেন তেমনি চৈতন্যও সেই যুগের সংস্কারাচ্ছন্নতাকে কাটিয়ে নতুন এক সংস্কার রচনা করতে চেয়েছিলেন যা হবে সঙ্কীর্ণতা ও হিংসা থেকে দূরতম রুচির এক জীবনযাপনশিল্প। তার মধ্যে ছিল নগরসঙ্কীর্তন, ছিল সঙ্গীত ও কাব্যচর্চা। এইগুলিই আধ্যাত্মিকতার বাতাবরণে সাধন করতে ব্যয়িত হয়েছিল চৈতন্যের জীবন।

এই চৈতন্যজীবনের পরিণামে পরবর্তীকালের পরিশীলিত বাঙালি জীবনের সাহিত্যে, সঙ্গীতে ও জীবনবোধে তাঁর একক ব্যক্তিত্বের একছত্র প্রভাব সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। এমনকি রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে যদি বৈষ্ণব উপাদানকে আলাদা করা সম্ভব হত তাহলে আর যাই হোক, যে-রবীন্দ্রনাথকে আমরা জানি তাঁকে পাওয়া সম্ভব হত না। মনে রাখতে হবে যে, যে-দুশো কুড়ি জন মুসলমান কবি বৈষ্ণব পদরচনায় হাত দিয়েছিলেন তা সম্ভব হয়েছিল চৈতন্যভাবনার যে প্লাবন ডেকেছিল তারই পলির সঞ্চয় থেকে। লালন ফকির ভালবাসায় তোলপাড়-করা ওই আবেশ কোথায় পেয়েছিলেন সেটা অনুসন্ধান করতে গেলেও এই প্লাবনের পরিণামের কথাই সামনে এসে যায়।

চৈতন্য যে কাজ হাতে নিয়েছিলেন তাতে রাজশক্তির, অর্থাৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্রব এড়িয়ে চলা অসম্ভব ছিল। নীলাচল পূর্ববর্তী তাঁর জীবনের প্রথম চব্বিশ বছরে এই সংস্রব ঘটেছিল বাংলার নবাব হুসেন শাহ’র সঙ্গে। সেই সংস্রবে প্রথমে ছিল দ্বন্দ্ব, পরে সন্ধি। ফলে, তাঁর বাংলায় থাকাকালীন রাজশক্তি ছিল তাঁর অনুকূল। কিন্তু অনুকূল ছিল না ব্রাহ্মণ্যসমাজ। তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল জন্মভূমিতেই। তার মোকাবিলা করতেই তিনি পুরীকে বেছে নেন কর্মক্ষেত্র রূপে এবং ১৫১০ খৃস্টাব্দে, মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে, তিনি তাঁর দলবল নিয়ে পুরীতে উপস্থিত হন। এই সময় বাংলার নবাব হুসেন শাহ’র সঙ্গে ওড়িশার রাজা প্রতাপরুদ্রদেবের যুদ্ধ চলছিল। বাংলা থেকে পুরী যাওয়ার পথে স্থানে-স্থানে অবরোধ তৈরি করা হয়েছিল এবং বাংলা থেকে আগত অনেক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গুপ্তচর সন্দেহে হত্যা করা হচ্ছিল। সেই হত্যালীলার পথ বেয়ে সেদিন চৈতন্যের সঙ্কীর্তনের দল পুরীতে প্রবেশ করেছিল।

সেই অশান্ত পুরীতে মাত্র দুই সপ্তাহ, মতান্তরে আঠারো দিন, থেকে চৈতন্য বেরিয়ে পড়েন দাক্ষিণাত্যের উদ্দেশে। পুরীতে এই অল্প কয়েকদিন অবস্থিতির মধ্যেই তৎকালীন ওড়িশার তিন প্রধান পুরুষ বাসুদেব সার্বভৌম, রাজার কুলগুরু কাশী মিশ্র এবং স্বয়ং রাজা প্রতাপারুদ্রকে তাঁর ব্যক্তিত্বের সুবাদে তাঁর সম্বন্ধে প্রবলভাবে উৎসাহী করে তোলেন। দাক্ষিণাত্যে প্রেমধর্ম প্রচার করবার সময় রাজমহেন্দ্রীর প্রশাসক রায় রামানন্দ চৈতন্যের সান্নিধ্যে আসেন এবং রাজকাজে ইস্তফা দিয়ে পুরীতে চলেন আসেন চৈতন্যের সঙ্গী ও সেবক হবেন বলে। ততদিনে সেখানেই চৈতন্য থাকতে শুরু করেছেন।

ক্রমে চৈতন্যকে ঘিরে চৈতন্যের অগোচরে রাজ্যশাসন ব্যাপারে একটি বিষয় ক্রমে-ক্রমে দানা বেঁধে উঠতে শুরু করল। ১৫০৯ খৃস্টাব্দে হুসেন শাহ যখন ওড়িশা আক্রমণ করেন তখন প্রতাপরুদ্র তাঁর সেনাপতি গোবিন্দ বিদ্যাধর ভৈ-এর হাতে উত্তর ওড়িশার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণ ভারতে পেন্নুর নদীর তীরে রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের আক্রমণ ঠেকাতে ব্যস্ত ছিলেন। গোবিন্দ বিদ্যাধর সুলতানি আক্রমণে পরাজিত হন এবং সারঙ্গগড় দুর্গে আশ্রয় নেন। সুলতানি বাহিনী বিনা বাধায় পুরী অবধি পৌঁছে যায়। যে সময় চৈতন্য পুরী পৌঁছান সেই একই সময়ে প্রতাপরুদ্র ঝড়ের বেগে কটকে এসে পৌঁছান এবং তাঁর প্রবল আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পিছু হটতে হটতে সুলতানি বাহিনী গড়মান্দারণে আশ্রয় নেয়। প্রতাপরুদ্র সেই দুর্গ অবরোধ করে অবরোধ রক্ষার দায়িত্ব গোবিন্দ বিদ্যাধরের হাতে তুলে দিয়ে দাক্ষিণাত্যে আক্রমণ প্রতিহত করতে আবার ফিরে যান।

এদিকে প্রতাপরুদ্রের অবর্তমানে হুসেন শাহ’র সেনাপতি ইসমাইল গাজির সঙ্গে গোবিন্দ বিদ্যাধরের সম্ভবত কোনো গোপন বোঝা-পড়া হয়ে অবরোধ তুলে নেওয়া হল এবং হুসেন শাহ’র অধিকার মান্দারণ

অবধি বিস্তৃত হয়ে পড়ল। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ ও রাজত্বের অন্যত্র বহু সামন্তরাজার বিক্ষুব্ধ অবস্থানে বিধ্বস্ত প্রতাপরুদ্র বিদ্যাধরের এই আচরণে প্রবল অসন্তুষ্ট হলেও তাঁকে শাস্তি না দিয়ে কলিঙ্গ প্রদেশের রাজ্যশাসনভার অর্পণ করে তাঁর মন জয় করে বশ্যতা আনার প্রয়াস করলেন।

এর পর ১৫১৪ খৃস্টাব্দে জানা গেল হোসেন শাহ আবার ওড়িশা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খবর শুনে প্রতাপরুদ্র এখন গৌড় আক্রমণ করতে চাইলেন। কিন্তু প্রেমধর্ম প্রচার করছেন যে চৈতন্য, তাঁরই পরামর্শে প্রতাপরুদ্র সে ইচ্ছা ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। প্রতাপরুদ্রকে এই পরামর্শ দেওয়ার পরে ওই বছরেই বিজয়া দশমীর দিন বৃন্দাবন যাওয়ার পথে হুসেন শাহ’র রাজধানী গৌড়ের কাছেই সদলবলে একদিন ঘাঁটি গাড়লেন চৈতন্য। হয়তো যুদ্ধেচ্ছু হুসেন শাহকে ঠেকা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। এইখানে হুসেনশাহ’র ব্যক্তিগত সচিব দবীর খাস ও রাজস্ব বিভাগের অধিকর্তা সাকর মল্লিক রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে চৈতন্যের সঙ্গে দেখা করলেন। এই সাক্ষাতের পরদিনই চৈতন্য বৃন্দাবনে না গিয়ে নীলাচলে ফিরে গেলেন এবং তার কয়েকদিনের মধ্যেই হুসেন শাহ’র এই দুই মহামন্ত্রী গোপনে গৌড় ছেড়ে পালালেন। (পরবর্তী কালে এরাই ছয় গোস্বামীর প্রধান দুই গোস্বামী সনাতন ও রূপ নামে বিখ্যাত হন।)

দবীর খাস ও সাকর মল্লিকের নিষ্ক্রমণে হুসেন শাহ’র অভীপ্সিত যুদ্ধ পিছিয়ে যায় এবং যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য প্রতাপরুদ্রও কিছুটা সময় হাতে পেয়ে যান। অবশেষে এই দুই মহামন্ত্রীর সাহায্য ছাড়াই ১৫১৫ খৃস্টাব্দের শেষের দিকে হুসেন শাহ ওড়িশা আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধে হুসেন শাহ পরাজিত হলেন। সেই যুদ্ধই হয়ে দাঁড়ায় হুসেন শাহ’র শেষ ওড়িশা যুদ্ধ। হুসেন শাহ’র পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে গোবিন্দ বিদ্যাধরের কৌশলে ওড়িশা অধিপতি হয়ে ওঠার স্বপ্নও বিফল হল। এই ঘটনায় চৈতন্য হয়ে উঠলেন “প্রতাপরুদ্র সংত্রাতা”– অর্থাৎ, প্রতাপরুদ্রের রক্ষক।

অনুমান করা যায়, প্রতাপরুদ্র ও হুসেনশাহ’র মধ্যে এই যুদ্ধটা ঘটিয়ে তোলার পরিকল্পনাটা গোবিন্দ বিদ্যাধরের মস্তিষ্কপ্রসূত। এতে তিনি কৌশলে ওড়িশার সিংহাসন দখল করতে পারতেন। চৈতন্যের সক্রিয় হস্তক্ষেপে এই ছক ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় গোবিন্দ বিদ্যাধরের সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ল চৈতন্যের উপরে। বিদ্যাধর লক্ষ্য করলেন যে রাজ্যপরিচালন ব্যাপারে রাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যের প্রতি এতটাই নির্ভরশীল যে জনগণের চোখে প্রতাপরুদ্র যেন নামেই রাজা, আসল রাজা হয়ে দাঁড়িয়েছেন গেরুয়াবসনধারী এই চৈতন্যই। বিদ্যাধরের এও মনে হল যে চৈতন্য থাকতে তিনি আর প্রতাপরুদ্রকে স্পর্শ করতে পারবেন না। চৈতন্যের মৃত্যু হলে সেটা হয়তো সম্ভব।

সে যুগেও পুরোহিততন্ত্র প্রবল ছিল। রাজ্যশাসন ব্যাপারে জগন্নাথ মন্দিরের পাণ্ডা বাহিনীর বিপুল ভূমিকা ছিল। স্বয়ং জগন্নাথ নাকি রাজা নির্বাচন, রাজ্যশাসন প্রভৃতি ব্যাপারে পাণ্ডা মারফৎ স্বপ্নযোগে নির্দেশ পাঠাতেন। পরোক্ষে থেকে পাণ্ডাবাহিনীই রাজনীতির নিয়ন্তা ছিল। চৈতন্যের ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে প্রথম দিকে তাঁদের মুগ্ধতা ঘটলেও চৈতন্যের উপস্থিতিতে তাঁদের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করলে চৈতন্যের প্রতি তাঁদের সেই মুগ্ধতাতেও ক্রমশ ভাটা পড়া শুরু হয়ে যায়। চৈতন্যের জাতিভেদ না মানা এবং জগন্নাথ মন্দিরে আচণ্ডাল প্রবেশাধিকার লাভ করুক তাঁর এই ইচ্ছা জগন্নাথ মন্দিরের পাণ্ডাসমাজ এবং ব্রাহ্মণ ও অভিজাতদের ক্রমশ তাঁর প্রতি বিমুখ করে তোলে।

সেদিন চৈতন্যের ভক্তি আন্দোলন এমন সর্বপ্লাবী হয়ে উঠেছিল পঞ্চসখা সম্প্রদায়ের অচ্চুতানন্দ পুরী থেকে প্রায় কুড়ি মাইল উত্তরে প্রাচী নদীর তীরে গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক গোপন সভার আয়োজন করেন। সেই সভায় সেইসব সম্প্রদায়ের নেতাদেরই ডাকা হয়েছিল যেগুলি রাজানুগ্রহের অভাবে ও চৈতন্যের প্রতি প্রতাপরুদ্রের সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে লোপ পেতে বসেছিল। সভার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, কোনো একটি বিশেষ ধারার (অর্থাৎ,চৈতন্যআন্দোলন) যাত্রাপথে যাতে অন্যান্য ধর্মীয় স্রোতগুলি ধ্বংস না হয় তার উপায় খোঁজা। অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে এই সম্প্রদায়গুলি তাদের হারানো প্রতিপত্তি ফিরে পেতে চৈতন্যবিরোধী কার্যকলাপে পরোক্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং তাতে গোবিন্দ বিদ্যাধরের ষড়ন্ত্রের পথ সুগম হয়ে উঠতে পারে।

প্রতাপরুদ্র যুদ্ধপ্রিয় রাজা ছিলেন না। চৈতন্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পর থেকে তাঁর রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা যে সঙ্কুচিত হয়ে চলেছিল, সেটা একটা ঘটনা এবং সেই কারণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা বাড়ছিল তাও সত্যি। এতে গোবিন্দ বিদ্যাধরের চৈতন্য ও প্রতাপরুদ্রবিরোধী প্রচার পায়ের তলায় শক্ত মাটি পাচ্ছিল। গোবিন্দ বিদ্যাধর যে মান্দারণের অবরোধ তুলে নিয়ে প্রতাপরুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন সেই খবর সাধারণ ওড়িশাবাসীর জানবার কথা নয়। ওড়িশাবাসী তাঁর সম্বন্ধে এইটাই জানতেন যে সুলতান বাহিনী যখন পুরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তিনিই মন্দিরের গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে বিগ্রহগুলিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মুসলমানদের হাতে অপবিত্র হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন এবং বিগ্রহগুলিকে দোলায় চড়িয়ে সংকটকালে চিল্কায় নিয়ে গিয়ে চড়াইগুহা পর্বতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর এই আচরণ স্মার্ত ও অভিজাতদের তাঁর প্রতি অনুকূল করেছিল তাতে সন্দেহ নেই।

চৈতন্য হত্যার বা অপসারণ সম্ভাবনা চৈতন্য নিজে এবং তখনকার অনেকেই অনুমান করে নিয়েছিলেন। অন্যায় শাসনব্যবস্থা যেখানে জারি থাকে, সেখানে সহজেই অনুমান করা যায় কোন কোন সত্যনিষ্ঠ মানুষ, কোন কোন নির্ভীক সাংবাদিক পদচ্যুত, নিখোঁজ বা নিহত হতে পারেন। তখন অপকর্মটি কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা সাধিত হয় না, সাধনের দায় বর্তায় ‘ব্যবস্থা’-টির উপর। এই ‘ব্যবস্থা’ জিনিসটি এমন যে প্রকৃতপ্রস্তাবে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে মুষ্টিমেয় মানুষ। বাকিরা তার সমর্থন জোগায়, নাহয় বিরোধিতা করে। চৈতন্য পরিকর যবন হরিদাস পুরীতেই বাস করতেন। তিনি চৈতন্যের চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন। তিনি বেঁচে থেকে চৈতন্যের মৃত্যু দেখতে চান না, এই অদ্ভুত যুক্তিতে তিনি অনশনে প্রাণত্যাগ করেন। যবন হরিদাস আহার ত্যাগ করায় চৈতন্য তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে শরীর অসুস্থ বলেই তিনি আহার ত্যাগ করেছেন কিনা। যবন হরিদাস উত্তরে জানিয়েছিলেন যে তাঁর মনই অসুস্থ। অনুমান করা যায় যে সেই ষড়যন্ত্রের আবহাওয়া এতটাই প্রকট ছিল যে, আত্মহত্যার প্রবল বিরোধী হয়েও, ঘটনার অমোঘতা বিচার করে চৈতন্য তাঁর বাপের বয়সী এই যবন হরিদাসকে আত্মহত্যায় নিবৃত্ত করবার তেমন যুক্তি খুঁজে পাননি।

লীলা সম্বরিবে তুমি লয় মোর চিত্তে ।

সেই লীলা প্রভু মোরে কভো না দেখাবা ।

আপনার আগে মোর শরীর পাড়িবা ।

চৈতন্য অন্তর্ধানের কিছু পূর্বে জগদানন্দ পণ্ডিত শান্তিপুরে আসেন। অদ্বৈত আচার্যের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। অন্যভাবে এবং জগদানন্দের সঙ্গে কথা বলে অদ্বৈত চৈতন্যের পরিস্থিতি তখন কী তা বুঝে যান। জগদানন্দের হাত দিয়ে অদ্বৈত আচার্য সাংকেতিক ভাষায় লেখা এই চিরকুটটি চৈতন্যকে সতর্ক করবার জন্য পাঠিয়েছিলেন-

বাউলকে কহিহ – লোক হইল বাউল ।

বাউলকে কহিহ – হাটে না বিকায় চাউল ।

বাউলকে কহিহ – কাযে নাহিক আউল ।

বাউলকে কহিহ – ইহা কহিয়াছে বাউল ।

অর্থাৎ অদ্বৈত চৈতন্যকে যা বলতে চেয়েছিলেন তাঁর অর্থ হল – আর বেশি লোক তোমার ওই গোপী প্রেমের তাৎপর্য গ্রহণ করতে রাজি হবে না – ‘হাটে না বিকায় চাউল! অনেকেই মনে করেন যে এই লেখার মধ্যে দিয়ে অদ্বৈত চৈতন্যের বিসর্জনের আগাম ইঙ্গিত দিয়েছেন।

একটা ‘ব্যবস্থার’ মধ্যে যখন কারুর, কোনো কিছুর প্রত্যাখ্যান অতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেটাকে অনেকেই অমোঘ বলে মেনে নিতে বাধ্য হন। ভগ্নস্বাস্থ্য ও বিপুল ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে চৈতন্যও পুরী ত্যাগ করবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। এই তথ্য চৈতন্য সমসাময়িক ওড়িয়া কবি কর্ণপুরের “চৈতন্যচন্দ্রোদয়” নাটকের দশম অঙ্কের ২৮০ নং শ্লোকে পাওয়া যায়। সেই শ্লোকে বলা হয়েছিল যে, হোরা পঞ্চমীর দিন চৈতন্য অদ্বৈতকে বলেছিলেন তিনি নীলাচল ত্যাগ করে বৃন্দাবনে গিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই তথ্য বৃন্দাবনদাস কবিরাজও সমর্থন করেন।

আমিহো আসিতেছি কহিয় সনাতনে।

আমার তরে এক স্থান করে বৃন্দাবনে।।

দেখা গেছে যে যেহেতু চৈতন্যের বৃন্দাবনে যাওয়ার তাড়া ছিল তাই কালবিলম্ব না করে সেখানে দ্বাদশআদিত্য টিলায় চৈতন্যের থাকার জন্য সনাতন একটি চালাঘর নির্মাণ করান।

দেখা যাচ্ছে, চৈতন্য পুরী বাস উঠিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়েছেন, বৃন্দাবনে তাঁর আবাসও প্রস্তুত হয়ে রয়েছে তবু তাঁর অন্তর্ধানই ঘটে বসল। তবে এইসব প্রস্তুতি ও তাঁর অন্তর্ধানের অন্তর্বর্তী পর্বে তাঁর অনুগামীদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর পুরীবাসই দীর্ঘায়িত হয়ে চলছিল। সাধারণ চৈতন্য পরিকর থেকে শুরু করে রাজা প্রতাপরুদ্র অবধি আসন্ন বিচ্ছেদ সম্ভাবনায় অতিরিক্ত অসহায় বোধ করতে থাকলেন এবং নানাভাবে চৈতন্যকে জানতে দিলেন যে চৈতন্যের অনুপস্থিতিতে পুরীবাসীর উপরে দারুণ দুর্দিন নেমে আসবে। প্রথমত সেই কারণে এবং দ্বিতীয়ত একা কেবল নিজের প্রাণ বাঁচাতেই গোপনে পুরী ত্যাগ করে যাওয়া তাঁর ব্যক্তিত্বের অনুকূল হল না।

ষড়যন্ত্র যখন ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছিল সেই পর্বে চৈতন্যকে হত্যা বা মৃত্যুভয় দেখানোর মতো কয়েকটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। আটঘাট বেঁধে এই রকম উদ্যোগ মোট চারবার নেওয়া হয়েছিল।

ক) প্রথমবারে ভাবের ঘোরে নাচতে নাচতে তিনি কোনো অচেনা পথে পাড়বিহীন কুয়োর মধ্যে আছাড় খেয়ে পড়েন। পাড়বিহীন কুয়ো পথের পাশে থাকতে পারে না। বৃন্দাবনদাসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে ওই সময় অদ্বৈত, স্বরূপ দামোদর ইত্যাদিরাও চৈতন্যের সঙ্গে ছিলেন, তবে কিছুটা পিছনে। অর্থাৎ তাঁরা নিশ্চিত কোনো অচেনা পথে যাচ্ছিলেন যার আশেপাশে অরক্ষিত কোনো কুয়োর কথা তাঁদের জানা ছিল না। তাই চৈতন্যকে বাধা দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। ফলে বিশ্বাসী মুখোশে আস্থাভাজন কোনো ব্যক্তি ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে এই যাত্রাপথ পরিকল্পনা করে থাকতে পারেন।

খ) আর একদিন রাত্রিকালে গম্ভীরার রুদ্ধকক্ষ থেকে চৈতন্য উধাও হয়ে গেলেন। গম্ভীরার ঘরটা ছিল কাশী মিশ্রের বাড়িতে, বাড়িটা আবার উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল। বহু অনুসন্ধানে তাঁকে সিংহদ্বারের উত্তরদিকে মাটিতে লুটানো অবস্থায় পাওয়া গেল।

গ) আরও একদিন একইভাবে গম্ভীরায় ভৃত্য ও দেহরক্ষী পাহারারত থাকা সত্ত্বেও চৈতন্যের অচেতন দেহ ঘরের দরজা, পাঁচিলের দরজা টপকে সিংহদুয়ারের দক্ষিণে ‘কলিঙ্গদেশীয় ‘গাভী-গণ মধ্যে নিপতিত’’ অবস্থায় পাওয়া গেল। পাহারা আরোপিত ঘর থেকে অলৌকিক ক্ষমতাবলে যদি তিনি বেরিয়েই যাবেন তাহলে জগন্নাথ মন্দিরের রত্নবেদীর সামনেই তো হাজির হয়ে যেতে পারতেন! এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। তুহিন মুখোপাধ্যায়ের অনুমান যে এই দুবারই তাঁকে পরিমিত মাত্রার বিষপ্রয়োগ করে অচেতন করা হয়েছিল।

ঘ) শরতের এক জ্যোৎস্নাধোয়া রাতে চৈতন্য ভাবাবিষ্ট হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন বলে কথিত আছে। স্রোতের টানে তাঁর দেহ কোনারকের দিকে ভেসে যায় এবং পরদিন খুব ভোরে এক জেলের জালে তাঁর মৃতপ্রায় অচেতন দেহ পাওয়া যায়। তার পর অল্প শুশ্রূষাতেই চৈতন্য সুস্থ হয়ে ওঠেন। এইরকম পাড়বিহীন কুয়োয় পড়ে যাওয়া, দু’বার অচেতন শরীর ঘরের বন্ধ দরজা ও বাড়ির পাঁচিল টপকে রাতের অন্ধকারে একবার মন্দিরের সিংহদুয়ারের উত্তরে আর একবার দক্ষিণে পৌঁছে যাওয়া – এইসব দেখার পর স্বরূপ-রামানন্দরা চৈতন্যকে সব সময় অত্যন্ত সতর্ক পাহারায় রাখতে শুরু করেছিলেন। বিশেষত রাতে তাঁরা আর শুধু ভৃত্য গোবিন্দর উপরে ভরসা করে নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন নি। রাতে স্বরূপ নিজে গোবিন্দের সঙ্গে গম্ভীরার দরজায় শুয়ে থাকতেন, এবং স্বরূপেরই নির্দেশে আর এক চৈতন্য পরিকর শঙ্কর পণ্ডিত গম্ভীরার ভিতরে শুতেন চৈতন্যের পায়ের কাছে। এরপর কিন্তু অন্তর্ধান হওয়ার আগে অবধি আর এইজাতীয় কোনো ‘দুর্ঘটনা’ কিংবা গম্ভীরার দেওয়াল-মেঝেয় মুখ ঘষে চৈতন্যের নাক-মুখ রক্তাক্ত হওয়া, কিংবা ‘অলৌকিকভাবে’ গম্ভীরা ত্যাগের মতো অঘটন ঘটে নি।

চৈতন্যের মৃত্যু সম্ভাবনা নিয়ে আজ অবধি যে ক’টি প্রধান কাহিনী চালু আছে সেগুলির কোনোটাই তথ্যগত ও যৌক্তিকভাবে সিদ্ধ নয়।

এক) কৃষ্ণ ভ্রমে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে বিলীন হয়ে যাওয়া। এই তথ্য সমর্থিত হয় নি। তাঁর অচেতন দেহ কোনারকের কাছে জেলের জালে ধরা পড়ে এবং তারপর তিনি বেঁচেও ওঠেন।

দুই) পায়ের ক্ষত থেকে সেপটিক হয়ে গিয়ে জ্বরবিকারে মৃত্যু। এও তেমনি। এ বিষয়ে যে-সমস্ত নথির সমাবেশ আছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে তাঁর জ্বরের সংকটকালীন বিকার উপস্থিত হয়েছে এবং অগণিত ভক্তবর্গের মধ্যে পঞ্চসখা সম্প্রদায়ের প্রধান পুরুষ জগন্নাথদাস ছাড়া অন্তিম মুহূর্তে আর কেউ পাশে নেই – ডাকা হয় নি কোনো রাজবৈদ্য, ব্যবস্থা হয় নি তখনকার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসারও; শুধু জগন্নাথদাস ক্ষতস্থানে গরম জল ঢেলে আরাম দিচ্ছেন। ফলে এই সম্ভাবনাও বাতিল করতে হয়।

তিন) জগন্নাথ বিগ্রহে লীন হওয়া কিংবা দারুব্রহ্মে বিলীন হওয়া। এই মৃত্যুসম্ভাবনার বিষয়ে বিপুল সংশয়, কারণ একই মৃত্যু নানা রচয়িতার হাতে নানা বিরোধী বর্ণনায় পূর্ণ এবং মন্দিরের ভিতরে সেই মৃত্যু হয়ে থাকলে মন্দির শোধনের কোনো নথি কোনোখানে পাওয়া যায় নি। মন্দির প্রাঙ্গনে মনুষ্যেতর প্রাণীর মৃত্যুতেও মন্দির শোধনের রীতি আছে।

চৈতন্যের শেষ প্রহর গ্রন্থে তুহিন মুখোপাধ্যায় চৈতন্য অন্তর্ধান বিষয়ে কী ঘটেছিল তার সম্ভাবনার সম্ভাব্যতার যুক্তিনিষ্ঠ ও নির্মোহ বিচার আছে। ঘটনা বিন্যাসের সম্ভাবনার যে সম্ভাব্যতা গবেষণার এই পর্ব অবধি চূড়ান্ত সেটা অনেকটা এইরকম:

ষড়যন্ত্রকারীরা সকলেই চরমপন্থী হন না। তাঁদের মধ্যে নরম, মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী সব রকমই থাকেন। চৈতন্য পরিকর রায় রামানন্দ তাঁর উচ্চপদের সুবাদে রাজনীতির অন্দরের খবর রাখতেন। তাঁর নিজস্ব গুপ্তচর থাকার সম্ভাবনাও প্রবল। তাঁর সঙ্গে দূত মারফৎ গোবিন্দ বিদ্যাধরের একটা সমঝোতা হয়ে থাকা সম্ভব যে চৈতন্যকে হত্যা করা হবে না, তাঁকে চিরকালের মতো ওড়িশা ছাড়া করা হবে। সরাসরি ব্রহ্মহত্যা হিন্দুধর্ম অনুযায়ী জঘন্যতম পাপ বলে এতদিন ষড়যন্ত্রকারীরা পরিমিত বিষপ্রয়োগ, পরোক্ষে দুর্ঘটনার মুখোমুখি করে দেওয়া জাতীয় উদ্যোগগুলিই চালিয়ে গেছেন। তাছাড়া, চৈতন্যকে হত্যা করা হলে যাঁরা ততটা চৈতন্য অনুসারী নন তাঁরাও হত্যাকারীদের পিছনে যে রাজনৈতিক শক্তি কাজ করবে তার প্রতি বিমুখ হওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা ছিল। এইসব কারণে এবং চৈতন্যের জগন্নাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার নানা উপাখ্যানের মধ্যে ঘটনা পরম্পরার সাধারণ লক্ষণগুলো দেখে চৈতন্য অন্তর্ধানের নাট্যদৃশ্যটা মোটামুটি এইরকম হওয়ার সম্ভাবনা যে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী চৈতন্য গর্ভগৃহের সামনে একা পৌঁছালেন। তাঁর প্রবেশ মাত্রই গর্ভগৃহের দরজা দ্রুত বন্ধ হয়ে গেল। এই দরজা একাধিক বলবান ব্যক্তির মিলিত চেষ্টা ছাড়া বন্ধ করা যায় না।

এর পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যে নাট্যদৃশ্যটা বাস্তবসম্মত ভাবে আঁকা যায় সেটা এইরকম। দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর ওড়িশা ত্যাগের দিনে জগন্নাথ বিগ্রহ স্পর্শ করামাত্রই চৈতন্যের মহাভাব হল। (এই মহাভাব স্বাভাবিক অথচ বিরল এক স্নায়ুগঠনতন্ত্রের সুবাদে ঘটতে পারে। অর্থাৎ, এটা একটা মেডিক্যাল কন্ডিশন হতে পারে। যেহেতু খুব কম লোকের এই ব্যাপারটা ঘটে থাকে তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই নিয়ে কোনো গবেষণা নেই!) প্রথম দর্শনেও তাঁর বিগ্রহ স্পর্শে এইরকম মহাভাব হয়েছিল। তখন দীর্ঘ সময় তাঁর শরীরে কোনো প্রাণের লক্ষণ ছিল না। এই মহাভাবের আশঙ্কাতেই তিনি বিগত চব্বিশ বছর গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন নি। আজ করলেন এবং প্রথম দিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। পাণ্ডারা মনে করলেন চৈতন্য মারা গেছেন। চৈতন্য অন্তর্ধানের দেড়শো বছর পরে পঞ্চসখা সম্প্রদায়ভুক্ত ওড়িয়া কবি ঈশ্বরদাস সেদিন গর্ভগৃহে কী ঘটেছিল গুরু পরম্পরায় শোনা গোপনীয় সেই সংবাদ জানালেন –

কেহু না জানে এহু রস । ভক্তঙ্ক মুখরে প্রকাশ।

লেখন নাহি শাস্ত্র পোথা অত্যন্ত গুপ্ত এহু কথা।।

তখন চৈতন্যের মৃতকল্প দেহ পঞ্চসখা সম্প্রদায়ের জগন্নাথদাসের নির্দেশে মন্দিরের গুপ্তপথ দিয়ে প্রাচী নদীর মোহনায় গোমতী তীর্থে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে জলের স্পর্শ পেয়ে চৈতন্যের প্রাণলক্ষণ ফিরে এসেছিল। জগন্নাথদাস যেহেতু চৈতন্যের অতি পরিচিত ছিলেন তাই চৈতন্যের এই অবস্থাটা ভাবসমাধি হতে পারে বলে অনুমান করেছিলেন। সেখান থেকে খুব সম্ভবত চৈতন্যকে সারঙ্গগড় বা চুরঙ্গগড় দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনা পরম্পরার বিশ্লেষণে এই সম্ভাবনা প্রবল বলে অনুমান হয় যে চৈতন্য বন্দী অবস্থায় প্রায় এগারো বারো মাস বেঁচে ছিলেন। স্বরূপ দামোদর চৈতন্য অন্তর্ধানের অব্যবহিত পরেই অন্তর্হিত হয়েছিলেন। চৈতন্যের বিশেষ প্রিয়পাত্র গদাধর পণ্ডিত অন্তর্হিত হয়েছিলেন চৈতন্য অন্তর্ধানের এগারো মাস পরে। (২৪. গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধানঃ হরিদাস দাস; হরিবোল কুটীর, নবদ্বীপ, ১ম সং, ৪৭১ চৈতন্যাব্দ, পৃ. ১১৯৯-১২০০) অনুমান যে মরণাপন্ন চৈতন্য তাঁর একান্ত প্রিয়পাত্র গধাধরকে একবার দেখবার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ষড়যন্ত্রকারীরা চৈতন্যের সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন বলে অনুমান।

চৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়াটা ভারতের, বিশেষ করে বাংলার ইতিহাসের অবিস্মরণীয় শূন্যতা। বাংলার যা-কিছু সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ তা যে অনেকাংশে চৈতন্য প্রভাবে ঘটেছে তা ন্যূনতম ইতিহাসবোধ থাকলে অনুভব করা যায়। মনে হয়, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া উন্নত প্রযুক্তি সহযোগে ঐতিহাসিকদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলে এই শূন্যতা দূর হতে পারে।

তথ্যসূত্র:

চৈতন্যমঙ্গল, জয়ানন্দ, উত্তরখণ্ড, পৃ.২৩৪।

কর্ণপুরমহাকাব্য,২০সর্গ, শ্লোক৩৭।

চৈতন্যভাগবত,বৈষ্ণবচরণদাস, ধর্মগ্রন্থস্টোরস, আমিনাবাজার, কটক২,পৃ.৬৮২।

Chaitanya and His Age, Dinesh Chanda Sen.

চর্যাপদসং,গুরুদাসসরকার, পৃ. ১৪৪।

History of Orissa, R.D. Banerjee, Bharatiya Publishing House, Delhi 338

শ্রীপদ্যাবলী, ৭৪।

রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল।

চৈতন্যের দিব্যজীবন, পৃ. ৫৮।

চৈতন্য চরিতামৃত, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, মধ্য-অষ্টম, পৃ. ১৭৬।

চৈতন্যের দিব্যজীবন, পৃ. ৫৯ বলরামদাস,চিত্তরঞ্জনদাস, সাহিত্যএকাদেমি, নিউদিল্লি, ১৯৮২, পৃ.১৮-১৯।

চৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্য-একাদশ, পৃ. ৪৫৭।

অদ্বৈত আচার্য লিখিত চিরকুট।

শ্রীচৈতন্যদেব, পণ্ডিত সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদ, পৃ. ৪১১।

কাঁহা গেলে তোমা পাই, জয়দেব মুখোপাধ্যায়, পৃ. ৬১।

চৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্য-ত্রয়োদশ, পৃ. ৪৬৭।

চৈতন্যের শেষ প্রহর, তুহিন মুখোপাধ্যায়, পৃ. ১১৯।

চৈতন্যভাগবত, বৃন্দাবনদাস,শেষ-একাদশ, পৃ.৩৮৭।

চৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্য-চতুর্দশ, পৃ. ৪৭৩-৭৪।

চৈতন্যের শেষ প্রহর, তুহিন মুখোপাধ্যায়, পৃ. ৯২।

চৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্য-ঊনবিংশ, পৃ. ৫০১-৫০২।

চৈতন্য ভাগবত, ঈশ্বরদাস, ৬৫ অধ্যায়।


Paramesh Goswami, a mechanical engineer from IIT Kharagpur by training, is a renowned writer and scholar. He has penned his concerns for the environment on various platforms. Some of his books are: দ্বা সুপর্ণা (1992), আবার বৃন্দাবন (2011), Rhapsody of Rabindra Sangeet (2018), Glimpses (2020), এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022). He is also the co-author of প্রগতি মরীচিকা (2006), জল (2014), and আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি (2016) and other thought-provoking books. His wanderlust has taken him to all parts of the world but his writings are far removed from conventional travelogues. His experiences in distant lands and with varied people have literally made him a world citizen and he moves effortlessly across contours of not just physical features of the world, but also the human mind and emotions. His realisations and feelings can best be summarised in his own words, “পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, এই কথা প্রায় সকলেই জানি, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে যে তিন ভাগ ভালোবাসা আর এক ভাগ ঔদাসিন্য আছে এই সত্যটা অন্তত আমার তেমন করে জানা ছিলো না ” (from the Introduction in his book এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022)). Rabindra sangeet is his soulmate – he loves listening to and singing them.

Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com