যা হারিয়ে যায় তা আগলে ব’সে রইব কত আর? – পরমেশ গোস্বামী
যা হারিয়ে যায় তা আগলে ব’সে রইব কত আর?
আর পারি নে রাত জাগতে, হে নাথ, ভাবতে অনিবার।।
আছি রাত্রি দিবস ধ’রে দুয়ার আমার বন্ধ ক’রে
আসতে যে চায় সন্দেহে তায় তাড়াই বারে বার।।
তাই তো কারো হয় না আসা আমার একা ঘরে।
আনন্দময় ভুবন তোমার বাইরে খেলা করে।
তুমিও বুঝি পথ নাহি পাও, এসে এসে ফিরিয়া যাও-
রাখতে যা চাই রয় না তাও, ধুলায় একাকার।।
যা হারাবার তা হারায়। সেগুলো হারাবার জন্যই একসময় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তলতলে মন সেটা মেনে নিতে পারে না। হারাবার ধনকে সে আগলেই বসে থাকে। কখন চাওয়ার ধন হারায়, ভয়টা এই। মন যখন এইরকম প্রিয় বস্তু পাহারা দিতে ব্যস্ত তখন অন্য কেউ, অন্য কিছু আমাদের ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা পায়। দুয়ার বন্ধ দেখে সেসব ফিরে যায়। ফিরে যদি নাও যায়, যদি ভিতরে প্রবেশ করবার উদ্যোগ নেয় তারা তখন, এতদূরও দাঁড়াতে পারে যে, তাদের তাড়িয়েও দিই। মনে সন্দেহ হয়, এই বুঝি আমার ধন
চুরি হয়ে গেল। আমার এই স্বভাব দেখে তেমন আগন্তুকের আমার ঘরে আসার সম্ভাবনাটাও কমে যায়। তখন অলক্ষ্য অর্গলের দ্বারা আমি একভাবে আপন ঘরেই বন্দী হয়ে থাকি। জগত কিন্তু সেই সময় আপন নিয়মে বইতেই থাকে। আমার ঘরের বাইরে জগতজুড়ে আনন্দলীলা চলতে থাকে। আমি আর তখন তার নাগাল পাই না। এমনকি এই জীবনের পরম পাওয়ার যে ধন,
হয়ত নিজেরই গরজে আমার ঠিকানা সন্ধান করে আমার কাছে আসতে চায়। তখন কিন্তু আমার দুয়ার বন্ধ। সে ধন ‘এসে-এসে ফিরিয়া’ যায়। অন্যদিকে, যে নশ্বরকে আমি বুক দিয়ে আগলে রাখি তা একদিন আমার বুকের আগল ঠেলে চলে যায়, – ‘ধুলায় একাকার’ হয়ে যায়। কোনো-এক সজাগ মুহূর্তে হঠাৎ মনে এই খেয়াল আসে যে প্রিয়বস্তু যদি আপন নিয়মে হারিয়ে যাওয়ারই হয়, তাতে আমি বাধ সাধি কেন? তাদের হারাবার ভয়ে নিজেই কেন ক্রমশ সমস্ত জগতকেই হারাতে বসি? কেন আঘাত বাঁচাতে গিয়ে নিজের কমনীয়তা জলাঞ্জলি দিই?
সজাগতার এই মুহূর্ত কখনো কখনো জীবনে আসে। দিনটা ছিল ১লা আশ্বিন, ১৩১৬ সাল (ইং ১৯০৯)। রবীন্দ্রনাথের তখন ৪৮ বছর বয়স। কাজের তাগিদে সেদিন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রয়েছেন। ওইদিন দিনের বেলায় অন্যান্য কাজের ফাঁকে সিটি অফ গ্লাসগো লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে রবীন্দ্রনাথ ৪০,০০০ টাকার একটা লাইফ ইনসিওরেন্স পলিসি করান। পলিসিটা হয় তাঁর একমাত্র জীবিত পুত্রসন্তান রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে। পনের বছরের পলিসি মেয়াদে তিন মাস অন্তর দেয় ৬৫০ টাকার প্রিমিয়াম।
রবীন্দ্রনাথ নোবেলপ্রাইজ তখনও পান নি। আশ্রম পরিচালনায় তখন থেকে থেকেই আর্থিক টানাটানি দেখা দিচ্ছে। সেই অবস্থায় কেবল পুত্রের নিরাপত্তার সুবাদে ভয়তাড়িত হয়ে এই পরিমাণ টাকা (তখনকার কালের মানদণ্ডে) গুনে যাওয়া রবীন্দ্রনাথের পক্ষে খুব সহজ ছিল না। ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকজন অতি অন্তরঙ্গ মানুষের মৃত্যু আঘাত অভিজ্ঞতা করে নিয়েছেন। বাল্য বয়সে মাতৃবিয়োগ এবং যৌবনকালে তাঁর ‘নতুন বৌঠানের’ মৃত্যু দেখেছেন। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু দেখেছেন ১৯০২ সালে, মধ্যমাকন্যা রেণুকার মৃত্যু দেখেছেন তার পরের বছরে, ১৯০৩ সালে। এরপর কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হল স্ত্রীর পঞ্চমতম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে, ১৯০৭ সালে। নিজ পরিবারের মধ্যে জীবিত রইলেন কেবল কনিষ্ঠা কন্যা মীরা ও জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা। কন্যারা বিবাহিতা।
তাঁর পরিবারভুক্ত রইলেন কেবল জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ। তিনিও উচ্চশিক্ষার্থে ১৯০৬ সাল থেকে আমেরিকা প্রবাসী ছিলেন। এই বছরে, মানে ১৯০৯-এ মাত্র কয়েকদিন আগে রথীন্দ্রনাথ কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে দেশে ফিরেছেন। তিনিই এখন তাঁর গৃহে বলতে গেলে ‘সবে ধন নীলমণি! তাঁর নিশ্চয় খটকা লেগেছিল এই ব্যাপারটায় যে সম্পর্কবেষ্টনী নয়, টাকার উপর নির্ভর করছেন পুত্রের সুরক্ষার জন্য। ব্যাপারটা তাঁর সেই মানসিক অবস্থায় ভীরুতার মতো লেগে থাকতে পারে। তাঁর মনে হয়ে থাকতে পারে যে এইসব করতে গিয়ে তাঁকে বলতে হবে – ১) ‘আছি রাত্রিদিবস ধরে দুয়ার আমার বন্ধ করে‘, ২) আসতে যে চায় সন্দেহে তায় তাড়াই বারে বার’, ৩) ‘তাই তো কারো হয় না আসা আমার একা ঘরে।‘
এই টানাপড়েনের মধ্যে সেদিনই সন্ধ্যাবেলায় লিখলেন এই গানটি – ‘যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইব কত আর।’

Paramesh Goswami, a mechanical engineer from IIT Kharagpur by training, is a renowned writer and scholar. He has penned his concerns for the environment on various platforms. Some of his books are: দ্বা সুপর্ণা (1992), আবার বৃন্দাবন (2011), Rhapsody of Rabindra Sangeet (2018), Glimpses (2020), এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022). He is also the co-author of প্রগতি মরীচিকা (2006), জল (2014), and আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি (2016) and other thought-provoking books. His wanderlust has taken him to all parts of the world but his writings are far removed from conventional travelogues. His experiences in distant lands and with varied people have literally made him a world citizen and he moves effortlessly across contours of not just physical features of the world, but also the human mind and emotions. His realisations and feelings can best be summarised in his own words, “পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, এই কথা প্রায় সকলেই জানি, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে যে তিন ভাগ ভালোবাসা আর এক ভাগ ঔদাসিন্য আছে এই সত্যটা অন্তত আমার তেমন করে জানা ছিলো না ” (from the Introduction in his book এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022)). Rabindra sangeet is his soulmate – he loves listening to and singing them.
Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com