“কান্তাসম্মিততয়োপদেশযুজে” : শ্রদ্ধায়-স্মরণে আমার ম্যাম অধ্যাপিকা ড.ঋতা চট্টোপাধ্যায় – অর্পিতা সিংহ চৌধুরী
কলমে : অর্পিতা সিংহ চৌধুরী
সময় : ২৯শে মে ২০২৫ সকালে লেখা
“বাজে বাজে রম্যবীণা বাজে“
সালটা ২০০৫, জুলাই-এর ১৪ তারিখে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম সংস্কৃত বিভাগে UG-1-এ। ১৮ই জুলাই ক্লাস শুরু হয়েছিল। আমি ২৫শে জুলাই থেকে ক্লাসে গেলাম।আমাদের প্রথম সেমেস্টারেই পাঠ্যসূচিতে ছিল দণ্ডীর “কাব্যাদর্শ”। R.C.ম্যাম পড়াতে এলেন। প্রথম দিনই তাঁর ক্লাসেই পড়ানোতে মন মুগ্ধ হয়ে গেল।তিনি যখন কাব্যাদর্শের প্রথম কারিকার ব্যাখ্যা পড়াচ্ছেন,প্রতিটা শব্দ-অর্থ-ব্যাখ্যা অন্তরকে স্পর্শ করছিল।ভাষায় আমরা সব সময় সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি না যদিও,তবুও “কাব্যাদর্শ”-এর প্রথমেই উল্লিখিত “সর্বশুক্লা সরস্বতী”-র রম্যবীণা আজও বেজে চলেছে আমার অন্তরে।
“জগত জুড়ে উদার সুরে আনন্দগান বাজে“
জগতজুড়ে যে আনন্দের আয়োজন,তার বোধ হল যখন Pg-2 তে “কাব্য” গ্রুপের ছাত্রী হলাম।প্রত্যেকের পড়ানোর গুণেই উপলব্ধি করলাম সাহিত্যের আস্বাদ। সে সময় “আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য” আমাদের ১৯তম কোর্স ছিল Pg-2 -এর 4th সেমেস্টারে। ম্যাম পড়াতে এলেন।তিনি এ বিষয়টায় অন্যতম পথিকৃৎ।
ছোটগল্প (সং.লঘুকথা) পাঠ্য ছিল আমাদের। শ্রী তারাপদ ভট্টাচার্য স্যারের লেখা “শৈবলী” গল্প টা পড়ানোর পরে,গল্প টা বিষয়ে একটা আলোচনা ম্যাম লিখে আনার হোমওয়ার্ক দিয়েছেন আমাদের।
যেহেতু আমি হোস্টেলে থাকতাম, একদিন বাড়ি থেকে ফিরে শুনলাম- ম্যামের এই হোমওয়ার্ক অন্যান্য সহপাঠীরা লিখে জমা করে ফেলেছে।আমারই দেওয়া বাকি। 2010-এর এপ্রিল চলছে তখন। আমি লিখে জমা দিলাম সবার শেষে।
যেদিন ম্যাম জমা দেওয়া খাতা গুলোর মূল্যায়ন করে ক্লাসে আনলেন আমি বিস্মিত হলাম আমার গ্রেড দেখে। ম্যামের হাতে A++ পেয়েছিলাম (লেখার নিচে ছবি দেখবেন)। আমার খাতাটা ম্যাম জেরক্স করে একটা কপি ওনাকে দিতে বলেছিলেন।
ছাত্রজীবনে এর চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া আমার কাছে দুর্লভ প্রাপ্তি বলেই মনে করি!
সেই প্রথম ম্যাম আমার লেখা পড়ে বুঝলেন–আমি লেখালেখি করি। হ্যাঁ ঠিকই। ক্লাস 3 থেকেই গল্প লিখতাম।
ম্যাম সেদিন থেকেই আমার না-বলা কথা পড়ে ফেললেন!
আমি বুঝলাম–যাদবপুরে এসে আমি আমার বাপাইয়ের মতোই এক অধ্যাপক পেয়ে গেলাম, যিনি আমার না-বলা কথা বুঝতে পারেন। সেই থেকেই যে অন্তরের বাঁধনে বাঁধা পড়লাম ম্যামের সাথে,তা বোধ করি মহাদেবের কৃপায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধন গুরু-শিষ্যের।
“আমার না–বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে“
তারপরে M.Phil, 2013-15 সাল। একটা কোর্সে পাঠ্য ছিল রামায়ণ,মহাভারত,পুরাণের কিছু অংশ।
রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের অংশবিশেষ পড়িয়ে ছিলেন ম্যাম। তিনি এতোখানিই ছাত্রদরদী ছিলেন যে, যে অংশটা পড়িয়ে ছিলেন “বাল্মীকীয় রামায়ণ”-এর একটা critical edition, যে বইটা CL (Central Library,J.U.) থেকে তোলা হয়েছিল, সেই জেরক্সটার বাঁধনসমেত খরচও তিনি দিয়েছিলেন। আমার এক সহপাঠী তার লাইব্রেরী কার্ডে সেই রামায়ণ তুলেছিল। কারণ বইটা তারও দরকার ছিল।
ম্যাম আমাদের সবাইকেই সমান স্নেহ করতেন। তবে কোনো ছাত্র-ছাত্রীর মিথ্যা কথনে নিমেষের মধ্যে তাঁর মুখের রং ও অভিব্যক্তির পরিবর্তন হয়তো বা আমার চোখেই পড়ত। ম্যাম তাকাতেন আমার দিকে একবার। আমি তাকিয়ে থাকতাম তাঁর দিকে। চেয়ে দেখতাম, তাঁর মুখের হাসি ম্লান হচ্ছে নিমেষে।
এমন অনেক ছোট ছোট ঘটনা আছে। যেগুলো এ স্মৃতিচারণে আর রাখলাম না।
“চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে নিয়ো না নিয়ো না সরায়ে–“
যাদবপুরের সংস্কৃত বিভাগ ছেড়ে এলেও সেই 2010 সাল থেকেই তাঁর সাথে যোগাযোগ ছিল আমার সারা বছরের। ফোনে-মেসেজে-মেইলে। ম্যাম ফোন করলে আমার assign tone ছিল–“চরণ ধরিতে“। ম্যামের Bsnl no. টার caller tune ছিল গায়ত্রী মন্ত্র।
একবার বেশ মনে আছে আমার,আমিও মাঝেমধ্যে আমার Bsnl no.-এ caller tune রাখতাম। মা তখন চলে গেছেন সদ্য। মাসখানেক হবে।আমার caller tune একটা শ্যামাসঙ্গীত রেখেছি। ম্যাম একদিন বিকেলে কিছু বলার জন্য আমায় ফোন করেছেন। আমার caller tune শুনে, ওমনি বলেছিলেন–“অর্পিতা! এটা কার গাওয়া রেখেছো এই গান? মূল গান পান্নালাল ভট্টাচার্যের গাওয়া। পারলে ওটা শুনে দেখো। সে গায়কীর আস্বাদই আলাদা!”
আমি বলেছিলাম–“হ্যাঁ ম্যাম! সেই গান শুনেই বড় হয়েছি। এগুলো মায়ের ভীষণ প্রিয় গান ছিল। আমাদের আগে ক্যাসেট ছিল। তবে এখন Bsnl caller tune থেকে কুমার শানুর গানটাই পেলাম, তাই রাখলাম”। সেদিন বুঝেছিলাম–ম্যামও কতখানি মন দিয়ে আমার caller tune শুনতেন! ম্যাম চলে যাওয়ার পর আর কখনও caller tune রাখিনি আমি।
2015-তে যখন ম্যামের কাছে M.Phil করছি, তখন একবার তাঁর হাত থেকে খাওয়ার সময় প্রেসারের ওষুধটা পড়ে যায়, ইউনিভার্সিটিতে ম্যামদের রুমে। আমি বলেছিলাম–“ম্যাম, যে ওষুধটা পড়ে গেছে, সেটা আর খাবেন না। ঘরটা সকাল থেকে পরিস্কার করা হয়েছে বলে দেখে মনে হচ্ছে না”। ম্যাম ওমনি হেসে বলেছিলেন, ওষুধের পাতাটা হাতে দিয়ে,” তুমি খুলে ওষুধটা হাতে দাও অর্পিতা, আমি খাই”।
অন্যান্য ক্লাস নিয়ে তখন ম্যাম ভীষণ ক্লান্ত। আমি গেছি তখন M.Phil-এর সন্দর্ভের লেখা দেখাতে। ওষুধ খাওয়ার পর ম্যাম বলেছিলেন–“তোমার কথাগুলো মম্মটের ওই কারিকার মতো অর্পিতা–“কান্তাসম্মিততয়োপদেশযুজে”
“আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন“
2022 সাল। মে মাস। আমার মা চলে গেছেন 2020-এর জানুয়ারীতে।
ম্যাম প্রায় আমায় মেসেজ-এ খোঁজ নিতেন। লিখতেন –“একা থাকো অর্পিতা। তোমায় নিয়ে আমার বড় চিন্তা হয়।”
মে মাসের পর whatsapp-এ একটা কবিতা লিখে পাঠিয়ে আর উত্তর পেলাম না। ওটাই মা যাওয়ার পরে আমার প্রথম লেখা কবিতা।
ম্যাম সেই 2010 সাল থেকেই সব সময় আমায় অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি যেন না ছাড়ি।
সেই বার ম্যামের উত্তর না পেয়ে মনে খটকা লাগল। ওই বছরই তাঁর বলা কিছু শব্দ, কয়েক মাস ধরেই আমার ভালো ঠেকছিল না। কোথাও থেকে তিনি আঘাত পেয়েছিলেন, কথা বলে বার-বার বুঝেছি সে কথা। তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন বুঝতে পারছিলাম।
“কনভারজেন্স”-এর সহকারী ভাই সুজিত, ম্যামের নাম্বার থেকেই আমার মেসেজের উত্তরে লিখেছিলেন। ম্যাম হাসপাতালে ভর্তি। ওই শেষ। তার আগেই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে আমার মেসেজের প্রেক্ষিতে উত্তর দিয়েছেন–“আমাদের বন্ধনগুলো অক্ষয় হোক”। ওটাই শেষ মেসেজ আমায়!
ওই বছরই প্রথম গুরুপূর্ণিমায় 12 বছর পরে সরাসরি আর যোগাযোগ করতে পারিনি ম্যামের সাথে। সেই পূর্ণিমায় তিনি জীবনযুদ্ধের লড়াই করছেন হাসপাতালে।
আমি সেই জুলাই মাসে চেয়ে রইলাম গুরু পূর্ণিমার চাঁদের দিকে! ঠিক তার পরের মাসে আগস্টে মেঘলা আকাশে রাসপূর্ণিমার চন্দ্র দর্শন হলো না আমার! ভোরে দুঃস্বপ্ন দেখলাম–ম্যাম তাঁর মৃদুকণ্ঠে আমায় বলে গেলেন–“আসি তাহলে অর্পিতা।”
12ই আগস্ট। সকালে ফোনে নেট অন করেই পেলাম দুঃসংবাদ।
ম্যাম সাদা ফুল ভীষণ ভালোবাসতেন। জুঁই, বেল ইত্যাদি ফুল বিশেষ করে। এখন যখন আমাদের বাড়ির ছাদে এই ফুলগুলো ফুটে আলো করে থাকে যেদিন, বুঝি ম্যাম তাঁর না-বলা কথা জানিয়ে গেলেন আমায়! ফুলের মালা গাঁথার মতোই যত্ন নিয়ে সম্পর্কের মালা গাঁথাও বড় সহজ কাজ নয়। শ্রদ্ধায়-স্মরণে ম্যাম পাদপদ্মে আমার সেই মালা রাখলাম স্মৃতিমেদুর হয়ে।
প্রত্যহ প্রার্থনা করি পরমেশ্বরের কাছে– ম্যাম শান্তি পান।
ভালো থাকুন।

অর্পিতা সিংহ চৌধুরী ,প্রাক্তনী,যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
সংস্কৃত ভাষা-শিক্ষিকা,কনভারজেন্স (আগস্ট 2024 থেকে)
Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com