শ্রীজীবসম্ভবসাহিত্যালোকম্
‘শ্রীজীবেন সম্ভবম্, সাহিত্যস্য আলোকম্’, শ্রীজীব সম্ভব সাহিত্যের আলোকে অবিরত বিস্ময়, ত্রিকালব্যাপ্ত জগৎ জীবনের অনবদ্য সমীক্ষণ, সমকালীন বাংলা হিন্দি বা ইংরাজী সাহিত্য সংস্কৃতির বিপুল জোয়ারের বাইরেও দেবভাষার অঙ্গনেও যে সারস্বত সৃষ্টির ইন্দ্রলোক নির্মাণ সম্ভব, শ্রীজীব লেখনীতে তার প্রথম অভিঘাত ‘সারস্বতশতকম্’ নামক চিত্রকাব্যটি, এমন সৃষ্টি যা প্রকাশিত হয়েই রাষ্ট্রপতির দরবারে স্বীকৃত সম্মানিত হয়।
চিরাচরিত লৌকিক সাহিত্যে, ‘চিত্রকাব্য’ আদ্যন্ত অপরিচিত এক সৃজন কর্মের রূপ। অতএব এ সম্বন্ধে পুরাতনী প্রাচ্য সাহিত্যতত্ত্বে কী বলা হয়েছে, তা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে। সংস্কৃত আলঙ্কারিক রাজশেখরের মতে, কাব্যিক শক্তি বা প্রতিভা দ্বিবিধ। কারয়িত্রী অর্থাৎ সৃজনশীল এবং ভাবয়িত্রী অর্থাৎ বোধনশীল। শ্রীজীব সৃষ্টি সম্ভারে এই উভয়ের সমাবেশ কতটা মনোমুগ্ধকর, তার প্রথম দৃষ্টান্ত তাঁর ‘সারস্বতশতকম্’ নামক চিত্রকাব্যটি। কারণ, প্রকাশিত গ্রন্থরূপে, এটিতেই শ্রীজীব প্রতিভার স্বাক্ষর মেলে প্রথমবার।
উৎকর্ষের তারতম্য অনুসারে সমগ্র সংস্কৃত কাব্যজগৎকে যে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, সেখানে ধ্বনি কাব্যের স্থান প্রথমে, গুণীভূত কাব্যের স্থান দ্বিতীয়ে, আর তৃতীয় শ্রেণির যে কাব্য, অলঙ্কার শাস্ত্রে তাকেই বলে চিত্রকাব্য। হয়তো এ কারণেই, সংস্কৃত সাহিত্যের স্বর্ণযুগ পার হয়ে গেলে, পরবর্তী মহীরুহ কবিসাহিত্যিক গণের যা কিছু কীর্তি, সেসব আর চিত্রকাব্যকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি। তৃতীয় শ্রেণির সাহিত্যকে নিয়ে কে আর অমরতার স্বপ্ন দেখেন? আলঙ্কারিক মম্মটাচার্যও বলেছেন, ‘ব্যঙ্গ্য বা ধ্বনিবিহীন শব্দালঙ্কার বা অর্থালঙ্কার প্রধান যে কাব্য তাকেই অবর বা অধম কাব্য বলে’, অর্থাৎ চিত্রকাব্যে যতই শব্দচ্ছটা থাক, অথবা অনুপ্রাসের আড়ম্বর, রসের বা ভাবের ব্যঞ্জনা তাতে নেই। আর সেই রসসন্দর্ভের আয়োজনে বা ভাবের গভীর তাতেই তো সাহিত্যের প্রাণ শক্তি নিহিত… অতএব সংস্কৃত সাহিত্য সৃজন সাম্রাজ্যে চিত্রকাব্যের স্থান খানিক পশ্চাতে নির্ধারিত হয়েছে।
কাব্যে নাটকে মহাকাব্যে প্রবন্ধে নিবন্ধে অনুবাদে এমনকি বহু সভার সভাপতির ভাষণেও যিনি পরবর্তী কালে তাঁর গভীর শাস্ত্রজ্ঞান বা সাহিত্যবোধের বিস্ময়কর পরিচয় পরিস্কুট করেছেন, সেই শ্রীজীবকবির প্রথম সাহিত্যিক অভিযাত্রা কেন যে আপাত গুরুত্বহীন চিত্র কাব্যকে ঘিরে শুরু হল, তার এক প্রাসঙ্গিক তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা তাঁর এক ভ্রাতুষ্পুত্র, সংস্কৃত শিক্ষা পরিষদে আয়োজিত শ্রীজীবের ১২৬ তম জন্ম স্মরণোৎসবের সভায় দিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা এই নিবন্ধে খুঁজে দেখব, চিত্রকাব্যকার স্বয়ং এ প্রসঙ্গে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেননা কবির চোখ দিয়ে কবির সৃষ্টিকে বিচারের বা মর্মে প্রবেশ করার আনন্দই আলাদা।
এই কাব্যের মধ্যেই শ্রীজীব কবি প্রশ্ন তুলেছেন, দেবতার সংখ্যা অনেক, তাহলে শ্লোকশতাত্মক ‘সারস্বতশতক’ রচনার প্রয়োজন কী? দেবী সরস্বতীরই বা মাহাত্ম্য কোথায়? দেবতারা দেববাণীর আরাধনা করলেও নির্ধন সাধারণ মানুষ, পদ্মা বা লক্ষ্মীকে ছেড়ে কেন সরস্বতীর আরাধনা করবেন? প্রশ্নের উত্থাপন যাঁর, সমাধান প্রচেষ্টাও তাঁর। চিত্র কাব্যের অধমতা উচ্চতা বিষয়ক তর্ককে সরিয়ে রেখে, সরস্বতীর সেবার্চনার প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছেন অভিজ্ঞ সাহিত্য সাধক শ্রীজীব।
উপাসনার দ্বারা লব্ধা সরস্বতী কিভাবে যুগে যুগে উপাসকের প্রতি কৃপাবর্ষণ করেছেন, দৃষ্টান্ত সহযোগে তিনি তা উপস্থিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর উত্থাপিত একটি অসাধারণ যমক অলঙ্কারের উল্লেখ করা যেতে পারেঃ
“ন কবিত্বং ন বিত্তং বা ন যশো নয় শোনায় ভিতম্
কাময়ে কামহানয়ে কামহং কামম্ আশ্রয়ে॥”
অস্যার্থ, আমি কবিত্ব কামনা করিনা। ধন দৌলত শাস্ত্রজ্ঞান শোভান্বিত যশ কিছুই প্রার্থনা করিনা। তাহলে ‘কামহানয়ে’ সংসার মূলভূতকাম বা ভোগেচ্ছা নিবৃত্তি জন্য ‘কাম’ অর্থাৎ কাকে আশ্রয় করব? অতএব সরস্বতীর উপাসনাই একমাত্রা আশ্রয়।
সারস্বত সাধকের চিত্রকাব্যটিতে রয়েছে বৃক্ষবন্ধ, পদ্মবন্ধ, মূরজবন্ধ, কাঞ্চীবন্ধ, হারবন্ধ, মাল্যবন্ধ, কঙ্কনবন্ধ, অক্ষমালা বন্ধ, গোমূত্রিকা বন্ধ, কুম্ভবন্ধ, ময়ূরবন্ধ, গদাবন্ধ, ফণিবন্ধ, অঙ্কুশ বন্ধ, প্রভৃতি প্রায় পঞ্চাশ রকমের বন্ধচিত্র, একশত শ্লোকের পরও রয়েছে আরো সাতটি শ্লোক। বস্তত, এতসব চিত্রালঙ্কারের সমন্বয়ে এটি একটি খন্ডকাব্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আলঙ্কারিক ক্ষেমেন্দ্রের অনুসরণে আমরা যদি বলি, ব্যাকরণাদি জ্ঞানদান করে বলে, ভট্টিকাব্যকে যদি কাব্যশাস্ত্র বলা যায়, অলঙ্কারাদি শাস্ত্রজ্ঞান দানের উৎকর্ষে তাহলে ‘সারস্বতশতকম্’ কেও কাব্যশাস্ত্রের মর্যাদা দেওয়া চলে। অধম কাব্য বলা কঠিন।
কাব্যটিতে অন্য অভিনবত্বও আছে। যেমন, একই শ্লোককে সংস্কৃত এবং বাংলা ভাষায় প্রকাশ করার অনন্য প্রয়াস। পাঠক মন বৈচিত্র্যের অভিলাষী, সেই বৈচিত্র্য সন্ধানে কবিও কি উৎসুক নন? তেমনই এক বিরল গোত্রীয় সৃজন উল্লাস হল, ‘শুভ্রোজ্জ্বলে শতদলে’ নামক শ্লোকটি, বাংলা সাহিত্যের গোত্রনির্ণয়ে এটি চতুর্দশপদী কবিতা, সংস্কৃতে আবার ‘বসন্ততিলক’ ছন্দে গ্রথিত। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য মত, এ শ্লোকে কোথাও অনুস্বার বিসর্গ ব্যবহৃত হয়নি, আবার সংস্কৃত ভাষার ছন্দ নির্মাণেও এজন্য কোন হানি ঘটেনি। এধরণের একই শ্লোকে দ্বিভাষিক বক্তব্য নির্মাণ একরকম অসম্ভব একটা ব্যাপার, যাকে সম্ভব করেছেন ‘শ্রীজীবসম্ভবসাহিত্যালোক’ এর অদ্বিতীয় রূপকার।
বিংশশতাব্দীর মেধামনন বিস্ময় তিনি। সংস্কৃত কাব্য জগতে অনিঃশেষ তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষার অভিযান, অপরিমেয় তাঁর অবদান বৈভব। খন্ড কাব্য থেকে বিলাপ কাব্য, শ্রব্যকাব্য থেকে মহাকাব্য, শতাধিক স্তবস্তোত্র গীতি, তাঁর রচিত পঁয়এিশটির অধিক নাটকে প্রয়োজন মত শ্লোকের অবতারণা… শ্লোক সৃজনের অভিনবত্বে কখন যে তিনি কালিদাসেরও অনুসারী, তার মনোরম দৃষ্টান্ত যে শ্রব্যকাব্যে, সেই ‘ঋতুচক্রচঙক্রমণম্’ সম্বন্ধে দুচার কথায় এবার আসা যাক।
এক্ষেত্রে প্রথমেই যে কথাটি মনে আসে, তাহলো, শ্রীজীবের কাব্যে বা নাটকে, সঙ্গীতের অপূর্ব ব্যবহার। কালিদাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘ঋতুসংহারম্’ – এর কথা মনে পড়িয়ে দেওয়া শ্রীজীব রচিত ‘ঋতুচক্রসংক্রমম্’ – এ অপূর্ব সঙ্গীতময়তার আবেষ্টনী, কাব্যটিকে ভিন্ন মাধুর্য্যে অভিষিক্ত করেছে। তাঁর বহু নাটক প্রহসনেও সঙ্গীতের রম্য উপস্থিত লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু আলোচ্য কাব্যটির ছত্রে ছত্রে সঙ্গীতের যে দ্যুতিময় ভাবাবেশ, প্রত্যেক ঋতুর ভিন্নতর চরিত্রকে উন্মোচন করেছে ভিন্নতর ভাবাবেগে, তার তুলনা বিশেষ একটা মেলে না।
কাব্যটির শুরু গ্রীষ্মকালের বর্ণনায় নয়। বসন্তকালের বর্ণনায় এর শুরু। বসন্তের শব্দচয়ন এমন সৌন্দর্যমন্ডিত যে তাতে বসন্ত বা বাহার রাগের সুর বসিয়ে গাইলেই হল। বসন্তের সমাগমে শ্রীজীব কবির বসন্ত বন্দনার ভঙ্গিটি অপ রূপঃ
কিমিব নবসুন্দরং সকলশুভলক্ষণং
পরমসুখমন্দিরং প্রকটিতমনুক্ষণং
জাতমিদমদ্যতনবিশ্বম্।
নয়নযুগ পশ্য সুখদৃশ্যম্।
প্রশ্ন জাগতে পারে, যে শ্রীজীব ব্যায়ামচর্চাদি করলেও, কখনো সঙ্গীত চর্চা করেছেন বলে শোনা যায়নি, তাঁর মধ্যে সঙ্গীতের প্রভাব এত প্রবল কিভাবে? উত্তরটা খোঁজা কঠিন নয়। রীতি সম্মত ভাবে চর্চা না করলেও বাড়ির ধারাতেই ছিল সঙ্গীতের বোধ, শ্রীজীব পিতা পঞ্চানন তর্করত্নের শিবসঙ্গীত, দূর্গাদাস লাহিড়ির ‘বাঙালীর দুশো বছরের গান’ গ্রন্হে মুদ্রিত হয়েছে। আত্মীয়তা সূত্রে ভাটপাড়ায় একসময় সঙ্গীত গুরু যদুভট্টও যাতায়াত করতেন। তাঁর সঙ্গীতময় জীবনের প্রতি শ্রীজীবের ছিল অগাধ টান। এছাড়া ভাটপাড়ার পন্ডিত সমাজ বহু সংগীত গুনীকেই দীর্ঘকাল তাঁদের গুণ বত্তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। অবশ্য সংবর্ধনা উপাধি তাঁরা অন্যগুনীদেরও দিতেন।
বসন্তের বর্ণনার পর এসেছে মৌনীব্রত গ্রীষ্মের কথা। তারপর বর্ষাকালের অনবদ্য বর্ণনা। বর্ষার কালো মেঘ, পীতবর্ণের বিদ্যুৎ, বজ্রধ্বনি যেন শ্যামলকান্তি পীতাম্বর কেশবের বেশ ধারণ করেছে। বজ্রধ্বনি যেন কেশবের পাঞ্চজন্যের কম্বুনাদ। গুরুগম্ভীর বর্ণনা ও শব্দচয়নে রাগ মল্লায়ের ছোঁয়া…
গগনং সঘনং শামলভাসং।
বিদ্যুদুদয় কৃত পীতবিলাসম্
অনুকুরুতে ননু কেশববেশং।
পাঞ্চজন্য রব বজ্রোন্মেষম্॥
শরৎ কালের দীপ্তিময়ী রূপ নবরাজবধূর মত, সে ঋতুর মহিমময়ী রূপবর্ণনা জগজ্জননী দশভুজার আগমনীতে। এসেছে কাশগুচ্ছ শিউলি ফুলের স্নিগ্ধতা ভরা শরৎ সকালের কথা, এসেছে কার্তিক সন্ধ্যায় আকাশ প্রদীপের কথা। এরপর শান্তসমাহিত মুনির রূপে প্রতিভাত হেমন্ত কাল। কিন্তু শীতের বর্ণিনায়? যেন বেজে উঠেছে সানায়ের করুণ রাগিনী। শীত যে দরিদ্রের সহনক্ষমতার নির্মম পরীক্ষা নেয়। কিন্তু মানুষের রাজ্যে যত বৈষম্য, মানুষের দুঃখকষ্টের কারণ হয়, তেমনটা কি প্রকৃতির রাজ্যে? তাঁর বহু নাটকেই দরিদ্র মানুষের দুঃখ কষ্ট বঞ্চনার কথা উঠে এসেছে, এটা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু প্রকৃতি, এই পথে চলেনা। শীতের নরম রোদ ধনীর প্রাসাদ আর দরিদ্রের পর্নকুটিরের মধ্যে কোন তফাৎ না করে সমান ভাবে উত্তাপ দেয় সকলকে।
তাঁর বহুরচনায় যে একধরণের সাম্যবোধ ঘুরে ফিরে এসেছে, ঋতুচক্র বিষয়ক খন্ডকাব্যটির মধ্যে প্রকৃতির স্ব-ভাবের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। হেমন্তকালের রাসপূর্ণিমা বা রাসোৎসব এমন নিবিড় ভালত্ববোধে উদ্বেল কেন, তার উত্তর সন্ধান করেছেন বড় স্নিগ্ধ অনুভবেঃ
শরদবসানে ভুবি হেমন্তঃ /
স্বৈরং প্রসরতি মুনিরিব শান্তঃ।
নাধিকতাপং নাধিকশৈত্যং /
বিতরতি শমতাং প্রাণিষু নিত্যম্।
ঋতুচক্র কাব্যটির বিশেষত্ব কোথায়? অবশ্যই এর শব্দ চয়নে, ভাব সৌন্দর্যে এবং একটি নম্রস্নিগ্ধ কাব্যিক পরিমন্ডল রচনায়। কথা-কোলাহল-কুনাট্যকুরুচির ক্রমবর্ধমান কুশ্রীতা যখন মানুষকে ক্লান্ত বিধ্বস্ত করে, তখন প্রাচ্য বিশ্বের প্রজ্ঞাবান কবি চিরন্তন ঋতু প্রকৃতির মধ্যে শান্তি লাভের আহ্বান জানান। আর সে আহ্বান, ঋতুচক্র যেমন নিত্যকাল আবর্তিত হয়ে পূনরায় ঘুরে আসে, কবি শ্রীজীবের অন্তরের স্নিগ্ধ আহ্বানও সেভাবে পাঠককে ঘিরে ঘিরে ধরে।
কবি শ্রীজীব থেকে মহাকবি শ্রীজীবে এবারে আমাদের ঈষৎ সঙ্কুচিত, ঈষৎ সাহসী অনুপ্রবেশ অভীপ্সা। মহাকবি শ্রীজীব পাঠক সমাজের জন্য কী কী বিস্ময় এনে উপস্থিত করেছেন, তার যেকোন আলোচনাই এতটা দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ যে, পাঠকের ধৈর্য, তার গভীর গম্ভীর মনন প্রেক্ষিত এবং সংস্কৃত ভাষা কৌলীন্যের নব নব বৈভব আবিষ্কারের কৌতূহল শেষ পর্যন্ত জীইয়ে থাকে কি থাকেনা, এই ভাবনাতেই এবারের লেখনী চালনায় খানিক সংযামী, খানিক সূত্র সন্ধানী হতে হচ্ছে।
একটি আঠারো সর্গের মহাকাব্য। পান্ডবদের বনবাসের শেষ পর্ব থেকে অজ্ঞাতবাসের পুরো ঘটনাকে অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিরাট পর্বের বিষয় বস্তুকে অবলম্বন করে গঠিত এই মহাকাব্য। বীর রস এখানে অঙ্গীঁরস কিন্তু এর অঙ্গঁরূপে শান্ত রসের বিন্যাস। দেড় হাজার শ্লোকের ‘পান্ডববিক্রমম্’ পরিকর বন্ধের নতুন দৃষ্টান্ত। নতুন কেন? মহাভারতের কাহিনী নিয়ে ‘কিরাতার্জুনীয়ম্’, রামায়ণের কাহিনী নিয়ে ‘উত্তররামচরিতম্’ এমনকি বাংলায় মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যকেও পরিকর বন্ধের উদাহরণ বলা হয়। মূলে কাহিনী একটিই, কিন্তু চারপাশ থেকে নানা কাহিনীর সমাহরণ করে, কাব্যের মধ্যে যে অভিনবত্বের সৃষ্টি প্রয়াস, বিংশ শতাব্দীতে তেমন এক আত্মিক প্রয়াস পান্ডববিক্রমম্… তাই এর ভেতর কার বক্তব্য বা ভাষাগত সৌন্দর্য্যে বিশেষত্ব, একটি চির চেনা বিষয় কে, তেমন তর ভাবেভাবনায় ছন্দে সৌন্দর্য্যে জড়িয়ে তাকে নতুনতর চেহারায় উপস্থিত করা যায়, সেই প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছেন কোন সে জ্ঞান তাপস? না, বয়স যখন তাঁর পঁচাত্তর পার হয়েছে। পঁচাত্তর বছরের এক পক্বকেশ বৃদ্ধ, জরাজীর্ণতায় যখন তাঁর শয্যালীন থাকার কথা, তখনো যদিও তিনি অধ্যাপনা করেন নিজ গৃহাঙ্গনে, সেই তিনি যদি নবীন উদ্যমে আঠারো সর্গের এক মহাকাব্যে হাত দিতে পারেন। তাকে ‘নতুন’ তো বলতেই হবে, বিশেষত মহাকাব্যের মত ‘থোড় বড়ি খাড়া’ বিষয়ের রচনায় নতুন যুগ আর যখন তেমন উৎসাহই পায়না। এক্ষেত্রে তাঁকে শুধু নতুন বললে সেটা নেহাৎ কম বলা হয়, এক্ষেত্রেও তিনি, অন্য অনেক কিছুর মতই পথিকৃৎ নিঃসন্দেহে।
একাধিক গবেষণা পত্র যে মহাকাব্যটিকে ঘিরে তৈরী হতে পারে, আমাদের ‘শ্রীজীবসম্ভব…’ নিবন্ধটিতে তার সম্বন্ধে কতটুকুই বা আলোচনা করা সম্ভব! তবু এ মহাকাব্যে শ্রীজীব যে বার্তা দিয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা নজর করলে দেখব, তাঁর প্রথম উপদেশ অথবা বার্তা, মানবজীবনে অবস্থান্তর ঘটেই। তবু যাদুকরী সত্য হল, সবথেকে দুঃখের অবস্থা থেকে সবথেকে গৌরবের শিখরেও আরোহন করা যায় একই জীবন বৃত্তে। দ্বিতীয় বার্তাটি হল, সততার জয়, ধর্মের জয়। ‘যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ’ প্রবাদ বাক্যের মত এই সত্যবোধ শ্রীজীবের বহুরচনায় ঘুরে দিয়ে এসেছে। আলোচ্য মহাকাব্যের অষ্টাদশ সর্গের অন্তিম অংশেও দেখা গেছে, অর্জুনের বক্তব্য একইভাবে উচ্চারিত হচ্ছে-
অগ্রে সরন্ অবদদর্জুন আশু রাজন্
সত্যং শিবং ভবতি সুন্দরমিত্যভিন্নম্।
সত্যশিব আর সুন্দরের সহাবস্থানেই জীবন ধর্মের স্থিতি, তারই জয়গানে কন্ঠ মিলিয়েছেন মনীষী শ্রীজীব, মহাকবি শ্রীজীব।
সেই সত্যসুন্দর শিবেরই সহাবস্থান শ্রীজীবের সমস্ত মহাকাব্য জুড়ে। যাইহোক, বহুকথা বলার থাকলেও, দুটি তিনটি দিকের কথা আমাদের স্মরণ না করলে নয়। এক্ষেত্রে প্রথমে তাঁরই লিখিত গ্রন্থভূমিকার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। নম্রভাষী শ্রীজীব লিখেছেন, অষ্টাদশ সর্গের অলঙ্কার ব্যবহার প্রসঙ্গে। সে এক আশ্চর্য কবিত্ব ও পান্ডিত্য স্ফূর্তির সুষম কাব্যিক সমারোহ বটে। বিশ্বনাথ কবিরাজের সাহিত্য দর্পণের দশম পরিচ্ছেদে উক্ত প্রায় প্রতিটি অলঙ্কারের শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের নির্দিষ্ট ক্রমে ব্যবহার করেছেন শ্রীজীব। একদিকে পান্ডবদের পরিচয় জ্ঞাপন, বিরাট রাজকন্যা উত্তরার সঙ্গে অভিমন্যুর বিবাহ, একই সঙ্গে অলঙ্কার শাস্ত্রের অনুগমন। শুধু উদাহরণ দেওয়া নয়, বিশ্বনাথ প্রদত্ত ক্রমেই শ্রীজীব প্রয়োগ করেছেন অলঙ্কারের। কতগুলি অলঙ্কার? সর্গটিতে মোট একশো বারোটি শ্লোক, আর তাতে মহাকবি শ্রীজীব ব্যবহার করেছেন দশ বারোটি নয়, বিরানব্বইটি অলঙ্কারের। দৃষ্টান্ত অভাবনীয়। স্তব্ধ করার মত।
শব্দালঙ্কার বৃত্ত্যনুপ্রাসের পাঁচ প্রকারই অনুসৃত হয়েছে তাঁর ‘রাজান্তঃ পুরঃ-রাজিতাজির-মিলদ্-রাজীবদৃগ্-যোষিতাং শ্রেণীষুজ্জ্বল’ শ্লোকটিতে। একাধিক ব্যঞ্জনের একইরূপে একবার মাত্র আবৃত্তি, ঐ রূপের একাধিক বার আবৃত্তি, একাধিক ব্যঞ্জনের একইরূপে ও ক্রমে একাধিকবার আবৃত্তি, একই ব্যঞ্জনের একবারই আবৃত্তি এবং একই ব্যঞ্জনের একাধিকবার আবৃত্তি।
অর্থালঙ্কারের ক্ষেত্রেও উপমা রূপক অতিশয়োক্তি দীপক নিদর্শনা দৃষ্টান্ত তো আছেই, এরা বহু প্রচলিত, এর বাইরে রয়েছে যথাসংখ্যম্ নামক অতি অপ্রচলিত অলঙ্কারের প্রয়োগ। ছন্দের ক্ষেত্রেও, প্রচলিত ছন্দগুলির বাইরে ত্রয়োদশ অক্ষর বিশিষ্ট ‘মত্তময়ূর’ ‘মৃগেন্দ্রমুখ’ বা কলহংস, মঞ্জুভাষিণী, ভুজঙ্গ প্রয়াত প্রভৃতির ব্যবহার করেছেন। মহাকাব্যের কাহিনী বয়নে তার আন্তঃশরীরী সৌন্দর্য নির্মাণে এবং একই সঙ্গে শৃঙ্গার রসাত্মক বর্ণনাকে দূরে সরিয়ে এক প্রসন্ন সুন্দর ভাববৈচিত্র্যকে গড়ে তোলবার মুন্সিয়ানায় শ্রীজীব এমন অনেক কিছুই প্রমাণ করে যান, যা সারস্বত সাধনার উচ্চাঙ্গের সিদ্ধি, তাতে ভেজাল মেশাবার কৌশলকে তিনি নম্র কিন্তু নৈতিক দৃঢ়তায় বর্জন করে চলেন।
শ্রীজীব সমকালে তিনি ভাটপাড়ার একমাত্র মহাকবি কিনা, স্থির নিশ্চিত নই, তবে তাঁদের বংশে আরেক মহাকবি, তাঁর পূজ্যপাদ গুরু তথা পিতৃদেব পঞ্চানন তর্করত্ন। সেই গুরুকে শ্রীজীব শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, এক চিরাচরিত প্রথা বা প্রকরণ শিরোধার্য করে। জাতিয়তাবাদী সারস্বত সাধক পিতা তাঁর, এক জীবনে কী বিপুল কর্মসাধনারও দৃষ্টান্ত গড়ে গেছেন, তা প্রতিটি সর্গের অন্তিম শ্লোকে, নবনব শ্লোকের সাহায্যে উল্লেখ করেছেন তিনি। দুই মহাকবি, একই মহাকাব্যের দুই পর্যায় নিয়ে রচনা করেছেন অষ্টাদশ সর্গের মহাকাব্য, প্রথম জনের ‘পার্থাশ্বমেধম্’ বিশ্বভারতীর পাঠ্য তালিকায় আধুনিক ভারতের মহাকাব্য হিসেবে প্রথমাংশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আরেকমহাকবিও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পাবার পাশাপাশি বিশ্বভারতীরই সর্বোচ্চ সম্মান ‘দেশিকোত্তমে’ ভূষিত হয়েছেন। ভাটপাড়া মনীষা, ভারতীয় মহাকাব্যের দ্যৌত্যে, এই বিংশ শতাব্দীতেই একাধিকবার রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর দ্বারা স্বীকৃত ও অভিবন্দিত, এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য নেহাৎ কম নয়। ‘পান্ডববিক্রমম্’ মহাকাব্যের প্রথম সর্গের অন্তিম শ্লোকটির সংখ্যা পঁয়ষট্টি, এবার আমরা অন্ততঃ এই একটি শ্লোকে মহাকবি পুত্র শ্রীজীব, তাঁর পিতার প্রতি কিভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, সেদিকে একটু মনোনিবেশ করতে পারি। লিখেছেন তিনি-
যোঽভুদ্ গৌতম গোত্র ভৃতিরতুলা ভা ভট্টপল্লী ভুবঃ
প্রস্থান ত্রয় ভাষ্য ভাস্বরযশাঃ আচার্য্য পঞ্চাননঃ।
তস্য জ্যেষ্ঠ সুতস্য সৃষ্টি ঘটিতে শ্রীজীব নাম্নো মহা-
কাব্যে পান্ডববিক্রমেঽগ্রিম ইতঃ সর্গো বিমর্ষাভিধঃ॥
বাংলা ভাষায় অর্থঃ যিনি গৌতম গোত্রের অতুলনীয় বিভূতিস্বরূপ, ভট্টপল্লী ভূমির দ্যুতি, যিনি উপনিষদ্ ব্রহ্মসূত্র ও গীতা এই প্রস্থানত্রয়ীর ভাষ্য রচনা করে উজ্জ্বল কীর্তি সম্পন্ন হয়েছেন, সেই আচার্য্য পঞ্চাননের শ্রীজীব নামক জ্যেষ্ঠপুত্রের কৃতি (পান্ডববিক্রম) নামক মহাকাব্যের বিমর্শ (পরামর্শ) নামক প্রথম সর্গ সমাপ্ত হল।
‘পান্ডববিক্রম’ সম্বন্ধে এত কথা বলার আছে, একটি দুটি প্রবন্ধ নয়, কয়েকটি গবেষণা গ্রন্থই এর ওপর রচিত হতে পারে। মহাকাব্যটি প্রকাশের ক্ষেত্রে যাঁদের ভূমিকা বা সহায়তা উল্লেখযোগ্য, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতিই মহাকবি শ্রীজীব তাঁর কৃতজ্ঞতা ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, আমরাও এই অবকাশে তাঁদের প্রতি অনেক সাধুবাদ জানাই, বিশেষত প্রকাশনা সহায়ক তাঁর দুই পুত্রকে, জ্যেষ্ঠ জানকীজীবন ন্যায়শাস্ত্রী এবং কনিষ্ঠপুত্র অধ্যাপক গবেষক কৃষ্ণজীবন ভট্টাচার্যকে, এঁরা উদ্যোগী না হলে হয়তো এ মহাকীর্তি অন্তরালেই থেকে যেত। হ্যাঁ, তাঁর বহু লেখা যেমন এখনো অপ্রকাশিত।
আমরা জানতেও পারতাম না, ভাটপাড়ার এক অধ্যাপক দার্শনিক নাট্যকার প্রাবন্ধিক মহাকবি, তাঁর সত্তর বছরে মহাকাব্য রচনায় হাত দিয়ে, তা সমাপ্ত করেছেন তিরানব্বই বছরের পরিণত বার্ধক্যে। আর তাঁর অন্তিম শ্লোক রচনা? তখন তাঁর বয়স সাতানব্বই বছর! এ অনন্য ভারতীয় মেধামনীষার প্রতি রইল অনন্ত প্রণাম।
Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com