রবীন্দ্রনাথের রচনাতে প্রাচীন ভারত (রবীন্দ্ররচনাসু প্রাচীনং ভারতম্)
This was prepared as a talk on ‘Ancient India in Tagore’s Writings’ that was delivered by Professor Rita Chattopadhyay on All India Radio on 7th May 1995, when she was a reader in Women’s College, Calcutta.
রবীন্দ্ররচনাসু প্রাচীনং ভারতং ভারতবর্ষং বা কীদৃশং প্রতিফলিতং প্রতিবিম্বিতং বা তদেব অধুনা বিচার্যম্ অস্মাভিঃ।
কবিবর্যঃ রবীন্দ্রনাথঃ ন কেবলং মহাকবিঃ অপি তু দার্শনিকঃ সাহিত্যিকঃ শিল্পী সঙ্গীতপ্রণেতা, সঙ্গীতনিষ্ণাতঃ সমাজবিজ্ঞানবেদী সকলকলাভিজ্ঞশ্চ- অস্মিন্ ন কিমপি তত্ত্বম্ অনবভাসিতং বিরাজতে।
প্রাচীনভারতবর্ষস্য চিন্তা-ঐতিহ্য-সাহিত্য-সমাজপ্রভৃতিভিঃ বহুধা এব প্রভাবিতঃ আসীৎ অসৌ কবিবরঃ।
যে এব মন্ত্রাঃ যানি এব নীতিবাক্যখানি তত্ত্বখানি তথ্যখানি চ বেদোপনিষদ্-রামায়ণ-মহাভারত-হিতোপদেশ-পঞ্চতন্ত্র-মনুসংহিতা-কালিদাস-গ্রন্থাদিষু বৌদ্ধগ্রন্থাদিষু পালিগ্রন্থাদিষু চ উপন্যস্তানি, তেষাং বহূন্যেব রবীন্দ্ররচনাসু প্রতিফলিতানি। অতঃ প্রাচীনভারতস্য ধ্যান-ধারনা-মন্ত্রাদিকং রবীন্দ্ররচনাসু- যদ্বা তস্য প্রবন্ধেষু, কাব্যেষু, কাব্যনাট্যেষু, নাট্যকাব্যেষু অপি চ গীতেষু প্রায়শ এব স্ফুটতয়া সমুপলভ্যতে।
সত্যদ্রষ্টা অসৌ কবিঃ। ‘ঋতম্ ঋতেন অপি হিতম্’ ইতি বেদোক্তবচনম্। ‘সত্যং শিবং সুন্দরম্’ ইতি প্রাচীনতত্ত্বম্। ‘রসো বৈ সঃ’ ইতি চ তত্ত্বম্ সুষ্ঠুতয়া তেন উপলব্ধম্। তন্নাম প্রতিফলিতম্ তদ্রচনাসু বহুত্র এব। ‘সাহিত্যের স্বরূপ’ ইত্যাখ্যপ্রবন্ধে উক্তং চ তেন ক্রান্তদর্শিনা – “Truth Beauty’ সত্যমেব সৌন্দর্যম্। তদেব সত্যে সৌন্দর্যরসো২নুভূয়তে যদা অন্তরে তস্য নিবিড়া সমুপলব্ধিঃ জায়তে” ইতি।
রবীন্দ্রনাথস্য ইয়ঞ্চ সত্যসাধনা শান্তমিত্যুপাসীত ইতি শ্রুতিশিক্ষাবাক্যং স্মারয়তি। যচ্চ শান্তং তদেব শিবং তদেব অদ্বৈতম্। পুনর্যচ্চ শান্তং তদেব সত্যম্। অতঃ সত্যং যদি শিবং ন ভবতি তদা সুন্দরমপি ন। তন্নাম সত্যং সুন্দরং তথা উপলব্ধং কবিনা। প্রতিফলিতং চ কাব্যেষু গীতেষু প্রবন্ধেষু চ। গীতাঞ্জলিকাব্যগ্রন্থস্য যাবার দিন ইতি কবিতায়াম্ উক্তম্-
যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই-
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।
মম গমনদিনে চেৎ শক্যতে বক্তুমিত্থং
জগতি যদিহ দৃষ্টং লব্ধমত্রাপি কিঞ্চিৎ।
অনুপরমনীয়ং তুল্যতা নাস্তি বিশ্বে
শতদলমিহ পদ্মং জ্যোতিরব্ধৌ সুরম্যং
মধুরমধুনিপীতং ধন্যধন্যো২স্মি তাবৎ
ইতি সুলপনশক্তির্ভাতু মে যানকালে।
(শ্রীযাদবেন্দ্ররায়ন্যায়তর্কতীর্থমহাভাগৈঃ অনূদিতঃ)
প্রাচীনসাহিত্য ইত্যাখ্যপ্রবন্ধগ্রন্থে রামায়ণ-শীর্ষকপ্রবন্ধে রামায়ণগতম্ আদর্শস্থানীয়ং সৌভ্রাত্রম্, সত্যপরত্বং, পতিব্রত্যম্, প্রভুভক্তিঃ, রাজ্ঞঃ প্রজানুরঞ্জকত্বম্ এব পুনঃ পুনরেব প্রশংসিতম্। যদেবোক্তম্ প্রাচীনগ্রন্থেষু ভূমৈব সুখং ভূমাত্বমেব বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ – তদপি রবীন্দ্রগ্রন্থেষু প্রতিধ্বনিতম্।
কাহিনীগ্রন্থনিবিষ্টে গান্ধারীর আবেদন ইত্যাখ্যকাব্যনাট্যে প্রাচীনভারতস্য মহান্ আদর্শঃ রূপায়িতঃ। অত্র গান্ধারী পুত্রস্নেহান্ধং ধৃতরাষ্ট্রং পুনঃ পুনরেব অনুরুদ্ধবতী- ধর্মরক্ষার্থং পুত্রস্য ত্যাগো২পি স্বীকার্যঃ। পুত্রসুখার্থং রাজ্যসুখার্থম্ অধর্মস্য আশ্রয়ং ন গচ্ছেৎ।
গান্ধারী – ত্যাগ করো এইবার-
ধৃতরাষ্ট্র – কারে হে মহিষী… কে সে জন আছে কোন্ খানে শুধু কহো নাম তার।
গান্ধারী – পুত্র দুর্যোধন,….
ধৃ – কী রাখিব তারে ত্যাগ করি?
গা – ধর্ম তব
ধৃ – কী দিবে তোমারে ধর্ম?
গা – দুঃখ নব নব।
গা – ত্যজাধুনা তম্
ধৃ – বদ কং হি দেবি?
গা – দুর্যোধনস্তে তনয়ঃ স এব
ধৃতরাষ্ট্রঃ পুত্ররেব কথয়তি-
ধৃ – রক্ষামি কিং তং বদ, বর্জয়িত্বা
গা – ধর্ম তবৈবং ননু রক্ষ নাথ
ধৃ – প্রদাস্যতে তে বদ কিং সঃ ধর্মঃ
গা – নবং নবং দুঃখমনেকশো মে।
ধৃতরাষ্ট্রঃ তু ন কেবলম্ দুর্যোধনস্য জনকঃ, পরন্তু সঃ রাজা অতএব ধর্মরক্ষকঃ, অতঃ গান্ধার্য্যাঃ প্রশ্নঃ-
ন কেবলস্ত্বং জনকঃ সুতস্য
ধর্মস্য সব্যেতরপাণিভূতো
রাজাধিরাজো২সি ন কিং পৃথিব্যাঃ?
ধর্মস্য রক্ষা ত্বয়ি তিষ্ঠতে২তঃ
জনেষু কশ্চিদ্যদি গে২মধ্যাৎ
সাধ্বীমদোষামবলাং চ নাবী-
মাকৃষ্য তস্যাঃ কুরুতে২বমানং
পৃচ্ছামি কিং তে নৃপ তর্হি কার্যম্?
তত্রৈব ভানুমতীবাক্যেন ক্ষত্রিয়রমণ্যাঃ ধর্ম এব স্ফুটতয়া প্রকাশ্যতে।
বীরস্য কঃ ধর্মঃ ভবেৎ ইতি কর্ণকুন্তীসংবাদঃ ইতি নাট্যকাব্যে স্ফুটতঃ এব উক্তম্। বীরঃ জয়লোভাৎ যশোলোভাৎ রাজ্যলোভাদ্বা বীরধর্মতঃ ন চ্যুতো ভবেৎ।
অতঃ কর্ণ বদতি কুন্তীম উদ্দিশ্য
ভিক্ষা মোর কাছে?
আপন পৌরুষ ছাড়া. ধর্ম ছাড়া আর যাহা
আজ্ঞা কর দিব চরণে তোমার।
পুনরেব বদতি মহামতিঃ কর্ণঃ-
জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে অয়ি,
বীরের সদ্গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।।
চিত্রাগ্রন্থগত ব্রাহ্মণ ইত্যাখ্যকবিতা ব্রহ্মবিদ্যাধ্যয়নব্যাপারে গুরুশিষ্যয়োঃ সম্পর্ক উদ্ঘাট্যতে। গুরুসকাশে শিষ্যস্য জাত্যাদিকং ন কদাপি বিচার্যম্ এব। অতঃ সত্যকামঃ আগম্য যদা জননীবার্তামুবাচ গুরুম্
সত্যকাম, বহু পরিচর্যা করি পেয়েছিনু তোরে।
জন্মেছিস্ ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে
গোত্র তব নাহি জানি।
সত্যকামস্য গোত্রং পিতৃপরিচয়ঃ নাস্তি তথাপি গুরুঃ গৌতমঃ শিষ্যপদে তস্য স্থানরক্ষণে দ্বিধাহীনঃ এব।
অব্রাহ্মণ নহ তুমি তাত,
তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত
অতঃ অধ্যাপনব্যাপারে গুরোঃ সকাশে শিষ্যস্য জাত্যাদিকং ন বিচারণীয়ম্। সত্যকামস্য সত্যনিষ্ঠত্বম্ সত্যবাদিত্বম্ ব্রাহ্মণস্য প্রথমঃ ধর্মঃ, সত্যকামঃ তদ্ধর্মেণ সাতিশয়ং সমৃদ্ধঃ, অতঃ তস্য ব্রাহ্মণত্ববিষয়ে গুরোঃ গৌতমস্য কঃ সন্দেহঃ স্যাৎ ন খলু সন্দেহলেশো২পি।
সা নাম দেশভক্তিঃ দেশপ্রীতিঃ বা রামায়ণযুগাৎ আরভ্য কালে কালে ধ্বনিতা, যদ্বা উক্তং রামায়ণে-
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।
সা নাম দেশপ্রীতিঃ কবীন্দ্রস্য বহুষু দেশাত্মকবোধকগীতেষু বারং বারং প্রতিধ্বনিতা
ও আমার দেশের মাটি, তোমার পারে ঠেকাই মাথা – অত্র দৃষ্টান্তঃ।
কণিকা ইতি কাব্যগ্রন্থস্য কাব্যকণিকাসু প্রাচীনভারতীয়সাহিত্যগতাঃ বহবঃ ধারণাঃ প্রতিফলিতাঃ। যথা- উদারচরিতানাম্ ইতি কাব্যখণ্ডঃ।
প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন
ফুটিয়াছে ছোটো ফুল অতিশয় দীন।
ধিক্ ধিক্ করে তারে কাননে সবাই-
সূর্য উঠি বলে তারে, ভালো আছ ভাই।
ইদং নাম স্মারয়তি-
অয়ং নিজঃ পরো বেতি গণনা হি লঘুচেতসাম্।
উদারচরিতানাং তু বসুধৈব কুটুম্বকম্।।
‘শান্তিনিকেতন’ ইতি প্রবন্ধগ্রন্থে যে এব প্রবন্ধাঃ সংকলিতাঃ তেষু প্রায়শঃ সর্বত্র এব প্রাচীনভারতস্য মূলমন্ত্রাঃ মূর্ত্তিং প্রাপ্তাঃ ইব। ‘তপোবন’ ইতি প্রবন্ধে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায়াঃ তত্ত্বম্, ‘ধীর যুক্তাত্মা’ ইতি প্রবন্ধে ‘নাতঃ পরং বেদিতব্যং হি কিঞ্চিৎ’ ইতি উপনিষদ্মন্ত্রঃ, অন্যত্রাপি ‘মধুবাতা ঋতায়তে’ ইতি মধুমতীসূক্তম্, ‘সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বম্’ ইতি সংজ্ঞানসূক্তম্ ‘ওঁ পিতা নো২সি’, ‘শৃণ্বন্তু বিশ্বে২মৃতস্য পুত্রাঃ’ – ইত্যাদিসূক্তানাং মন্ত্রাণাং ভাবাঃ রবীন্দ্ররচনাসু সর্বত্র অনুরণিতা ইব।
অতঃ রবীন্দ্ররচনাসু দৃশ্যতে কুত্রাপি বেদমন্ত্র-উপনিষন্মন্ত্রাদীনাং ভাবাঃ গৃহীতাঃ – যথা শান্তিনিকেতন ইত্যাখ্যগ্রন্থস্য প্রবন্ধেষু, কণিকা, চিত্রা, নৈবদ্য, গীতাঞ্জলি প্রভৃতিকাব্যগ্রন্থানাং কাব্যেষু , গীতবিতান ইতি গ্রন্থস্য গীতেষু। কুত্রাপি রামায়ণমহাভারতাদিপ্রাচীনসাহিত্যস্য আখ্যানাদিকম্ আশ্রিতম্- যথা বাল্মীকিপ্রতিভা, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি নৃত্যনাট্যসমূহেষু, কুত্রাপি প্রাচীনভারতস্য তদ্গতসাহিত্যস্য মূল্যায়নং কৃতম্ – যথা রামায়ণ, কুমারসম্ভব ও শকুন্তলা, শকুন্তলা, মেঘদূত, কাদম্বরীচিত্র – ইত্যাদিপ্রবন্ধেষু, কুত্রাপি সমালোচনং কৃতম্- যথা কাব্যের উপেক্ষিতা ইত্যাদি প্রবন্ধেষু, কুত্রাপি বা প্রাচীনভারতস্য বৌদ্ধসাহিত্যস্য উপাখ্যানমবলম্ব্য বিরচনং কৃতম্ – যথা অবদানশতকম্ অবলম্ব্য পূজারিণী, বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতাম্ অবলম্ব্য – অভিসার, মহাবস্ত্ববদানমবলম্ব্য পরিশোধ কাব্যনাট্যম্ কৃতম্, কুত্রাপি পালিগ্রন্থম্ আশ্রিত্য প্রবন্ধঃ রচিতঃ – যথা ধম্মপদম্।
কুত্রাপি প্রশংসিতম্, কুত্রাপি আলোচিতং সমালোচিতং বা। যথা তথা বা ভবতু প্রাচীনভারতং রবীন্দ্ররচনাসু প্রতিছত্রম্ বিরাজতে ইব।
উপসংহারে শেষসপ্তক ইতি কাব্যগ্রন্থে নিবিষ্টা পঁচিশে বৈশাখ ইতি কবিতা শ্রীবিমলকৃষ্ণমতিলালমহোদয়কৃতানুবাদেন সহ উল্লিখ্যতে – অত্রাপি তেনৈব ঋষিণা রবীন্দ্রনাথেন পরমশিল্পিনঃ স্নেহস্পর্শনম্ অনুভূতম্, চরমসঙ্গীতস্য ঐকতানং শ্রুতম্, তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ ইতি নাম তত্ত্বম্ উপলব্ধম্।
তত্রাপি কস্যচিৎ অজ্ঞাতাশিল্পিনঃ স্নেহস্পর্শনমেব অনুভূতং তেন চরমসঙ্গীতস্য ঐকতানঞ্চ শ্রুতম্।
পঁচিশে বৈশাখ চলেছে
জন্মদিনের ধারাকে বহন করে
মৃত্যুদিনের দিকে।
সেই চলতি আসনের উপর বসে কোন্ কারিগর গাঁথছে
ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়
নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা।।
ব্রজতি বৈশাখে পঞ্চবিংশো দিবসঃ।
জন্মদিবসধারাবাহী মৃত্যুদিনমভি।
চলে তস্মিন্নাসনে স্নিত্বা
শিল্পিনা, ন জানে, কেনচিৎ।
ক্ষুদ্রে জন্মমৃত্যুনাং প্রান্তরে পরিসংগৃহ্য
রবীন্দ্রনাথদলানি গৃহ্যতে কাচিন্মালিকা।।
পুনরপি উক্তম্-
যাবার সময় এই মানসী মূর্তি
রইল তোমাদের চিত্তে,
কালের হাতে রইল বলে করব না অহংকার।।
তারপরে দাও আমাকে ছুটি
জীবনের কালো-সাদা-সূত্রে-গাঁথা
সকল পরিচয়ের অন্তরালে,
নির্জন নামহীন নিভৃত-
নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে
সুরমিলিয়ে নিতে দাও
এক চরম সংগীতের গভীরতায়।।
প্রস্থানসময়ে মানসীয়ং মূর্ত্তি
রর্পিতা ভবতাং চিত্তপটে,
অতো মহাকালকরে সমর্পিতেতি
নাত্র গর্বমাবধ্নামি।
তদনন্তরঞ্চ বিরামং প্রার্থয়ে২হং স্বকর্মণঃ।
জীবনস্য শুভ্র-কৃষ্ণ-সূত্র-গ্রথিতপরিচয়মালানাম্
অন্তরালে নির্জনে নিরুপাধিকে স্থানে
বিবিধস্বরৈর্বহুতন্ত্রীকৈর্যন্ত্রৈর্নাম
কস্যচিদপি চরমসঙ্গীতস্য
গভীরমৈকতানং যথা বিরচয়িতুং শক্নুয়াম্
তথাস্তু।
সংস্কৃতভাষয়া পত্রত্রয়ং ময়া রচিতম্। তেষু পত্রদ্বয়ম্ ‘রবীন্দ্ররচনাসু প্রাচীনং ভারতম্’ ইতি পুনশ্চ‘সরস্বতী নদীরূপা দেবীরূপা’ চেতি দ্বয়ম্ কলিকাতাবেতারমাধ্যমেন প্রসারিতম্। তৃতীয়ম্ অধিকৃত্য কিঞ্চিন্নাম উপস্থাপয়িতুম্ ইচ্ছামি।
রবীন্দ্রনাথের রচনাতে প্রাচীন ভারত
অনুবাদক- সুজিত মাইতি
(অ্যাকাডেমিক অ্যাসিস্ট্যান্ট, কনভারজেন্স)
প্রবন্ধ সংক্ষেপ
এই পত্রে মূলত রবীন্দ্ররচনাবলীতে প্রাচীন ভারতবর্ষের যে চিত্র ফুটে উঠেছে সেটাই বিচার করা হয়েছে। এখানে রবীন্দ্রনাথকে শুধুমাত্র কবিগুরু হিসাবে দেখানো হয়নি, তাঁর মধ্যে বিরজামান দার্শনিক শিল্পী সঙ্গীতপ্রেমী সমাজসেবক ইত্যাদি সত্তাকেও তুলে ধরা হয়েছে। বেদ উপনিষৎ রামায়ণ মহাভারত হিতোপদেশ পঞ্চতন্ত্র মনুসংহিতা কালিদাসের রচনাসমগ্র থেকে বিবিধ মন্ত্র বা নীতিবাক্য বা তত্ত্বকথা রবীন্দ্ররচনাবলীতে অর্থাৎ তাঁর প্রবন্ধে কাব্যে নাটকে গানে প্রভৃতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। সত্যদ্রষ্টা এই কবি সত্য শিব ও সুন্দরের পূজারী ছিলেন। ‘সাহিত্যের স্বরূপ’ প্রবন্ধে তিনি সাক্ষাৎ বলেছেন – ‘Truth Beauty’.
রবীন্দ্রনাথের এই সত্যসাধনা বেদোক্ত শান্তের উপাসনাকে স্মরণ করায়। অদ্বৈতমতে যেটাই শান্ত সেটাই শিব। অতএব সত্য যদি শিব না হয় তাহলে সুন্দরও বলা চলে না এটাই তাঁর অভিমত। তাঁর এই সত্য ও সুন্দরের অনুভূতি প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কৃতিত্বে। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্হে ‘যাবার দিন’ এই কবিতায় তিনি বলেছেন –
“যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই-
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।”
শ্রীযাদবেন্দ্ররায় ন্যায়তর্কতীর্থ মহাশয়ের সংস্কৃত অনুবাদটিও সাথে যুক্ত করা হল –
মম গমনদিনে চেৎ শক্যতে বক্তুমিত্থং
জগতি যদিহ দৃষ্টং লব্ধমত্রাপি কিঞ্চিৎ।অনুপরমনীয়ং তুল্যতা নাস্তি বিশ্বে
শতদলমিহ পদ্মং জ্যোতিরব্ধৌ সুরম্যং
মধুরমধুনিপীতং ধন্যধন্যো২স্মি তাবৎ
ইতি সুলপনশক্তির্ভাতু মে যানকালে।
‘প্রাচীন সাহিত্য’ এই প্রবন্ধগ্রন্হের ‘রামায়ণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি রামের ভ্রাতৃত্ব সত্যপরায়ণতা পতিধর্মশীল প্রভুভক্তি প্রজানুরাগীতাকে বারবার প্রশংসা করেছেন। ঠিক তেমনি ‘গান্ধারীর আবেদন’ কাব্যেও প্রাচীনভারতের মহান আদর্শকে তুলে ধরা হয়েছে। গান্ধারী পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে বারবার অনুরোধ করছে যে ধর্মরক্ষার জন্য পুত্রের ত্যাগও উচিৎ। পুত্র সুখের জন্য অধর্মের আশ্রয় নেওয়া ঠিক না। সাথে সংস্কৃত অনুবাদও প্রদত্ত হল –
গান্ধারী – ত্যাগ করো এইবার-
ধৃতরাষ্ট্র – কারে হে মহিষী… কে সে জন আছে কোন্ খানে শুধু কহো নাম তার।
গান্ধারী – পুত্র দুর্যোধন,….
ধৃ – কী রাখিব তারে ত্যাগ করি?
গা – ধর্ম তব
ধৃ – কী দিবে তোমারে ধর্ম?
গা – দুঃখ নব নব।
গা – ত্যজাধুনা তম্
ধৃ – বদ কং হি দেবি?
গা – দুর্যোধনস্তে তনয়ঃ স এব
ধৃতরাষ্ট্রঃ পুত্ররেব কথয়তি-
ধৃ – রক্ষামি কিং তং বদ, বর্জয়িত্বা
গা – ধর্ম তবৈবং ননু রক্ষ নাথ
ধৃ – প্রদাস্যতে তে বদ কিং সঃ ধর্মঃ
গা – নবং নবং দুঃখমনেকশো মে।
প্রবন্ধকার ম্যাডাম চট্টোপাধ্যায় বীরের ধর্ম প্রসঙ্গে কর্ণকুন্তীসংবাদ এই নাটক থেকে কর্ণ-কুন্তীর উক্তি-প্রত্যুক্তিও প্রমাণরূপে তুলে ধরেছেন। বীর জয়ের লোভে বা যশের লোভে বা রাজ্য লোভে তাঁর বীরত্বকে ত্যাগ করে না। তাই কর্ণের মাতা কুন্তীর উদ্দেশ্যে নিবেদন-
“ভিক্ষা মোর কাছে?
আপন পৌরুষ ছাড়া. ধর্ম ছাড়া আর যাহা
আজ্ঞা কর দিব চরণে তোমার।”
আবারও বলছে যে-
“জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে অয়ি,
বীরের সদ্গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।।”
চিত্রা গ্রন্হের অন্তর্ভুক্ত ব্রাহ্মণ ইত্যাখ্য কবিতায় ব্রহ্মবিদ্যা অধ্যয়ন প্রসঙ্গে প্রাচীন ভারতে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক প্রকাশ পেয়েছে। শিষ্যের জাত-পাত বিচার গুরুর কাম্য নয়।
“সত্যকাম, বহু পরিচর্যা করি পেয়েছিনু তোরে।
জন্মেছিস্ ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে
গোত্র তব নাহি জানি।”
সত্যকামের গোত্র পিতৃপরিচয় অজ্ঞাত সত্ত্বেও গুরু গৌতম সত্যকামকে শিষ্যপদে রাখতে দ্বিধাহীনই ছিল-
“অব্রাহ্মণ নহ তুমি তাত,}
তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত”
রামায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বচন হল- ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’। মূলত রামায়ণের কাল থেকেই যে দেশত্বপ্রীতি ধ্বনিত হয়েছে তার প্রতিধ্বনি রবীন্দ্রনাথের বিবিধ দেশাত্মবোধক গানে শোনা যায়-
“ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।”
‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্হের কাব্যকণার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রাচীন ভারতবর্ষের সাহিত্যগত উপাদান প্রতিফলিত হয়েছে-
“প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন
ফুটিয়াছে ছোটো ফুল অতিশয় দীন।
ধিক্ ধিক্ করে তারে কাননে সবাই-
সূর্য উঠি বলে তারে, ভালো আছ ভাই।”
যা আমাদের সংস্কৃত সাহিত্যের নিম্নলিখত শ্লোকটিকে স্মরণ করায়-
‘অয়ং নিজঃ পরো বেতি গণনা হি লঘুচেতসাম্।
উদারচরিতানাং তু বসুধৈব কুটুম্বকম্।।’
অতএব বেদ উপনিষদের শাশ্বত বাণী কখনও রবীন্দ্রসাহিত্যে ‘’শান্তিনিকেতন’ এই প্রবন্ধে কখনও বা ‘কণিকা’, ‘চিত্রা’, ‘নৈবদ্য’, ‘গীতাঞ্জলি’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্হে কখনও বা ‘গীতবিতান’-এর গানের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
উপসংহার অংশে ‘শেষ সপ্তক’ এই কাব্যগ্রন্হে অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতা সাথে শ্রী বিমলকৃষ্ণ মতিলাল মহোদয়ের সংস্কৃত অনুবাদও যুক্ত হল। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’ এই তত্ত্বের উপলব্ধি তাঁর হয়েছিল-
“যাবার সময় এই মানসী মূর্তি
রইল তোমাদের চিত্তে,
কালের হাতে রইল বলে করব না অহংকার।।
তারপরে দাও আমাকে ছুটি
জীবনের কালো-সাদা-সূত্রে-গাঁথা
সকল পরিচয়ের অন্তরালে,
নির্জন নামহীন নিভৃতে
নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে
সুরমিলিয়ে নিতে দাও
এক চরম সংগীতের গভীরতায়।।”
বিমলকৃষ্ণ মতিলাল মহোদয়ের সংস্কৃত অনুবাদ-
‘প্রস্থানসময়ে মানসীয়ং মূর্ত্তি
রর্পিতা ভবতাং চিত্তপটে,
অতো মহাকালকরে সমর্পিতেতি}
নাত্র গর্বমাবধ্নামি।
তদনন্তরঞ্চ বিরামং প্রার্থয়ে২হং স্বকর্মণঃ।
জীবনস্য শুভ্র-কৃষ্ণ-সূত্র-গ্রথিতপরিচয়মালানাম্
অন্তরালে নির্জনে নিরুপাধিকে স্থানে
বিবিধস্বরৈর্বহুতন্ত্রীকৈর্যন্ত্রৈর্নাম
কস্যচিদপি চরমসঙ্গীতস্য
গভীরমৈকতানং যথা বিরচয়িতুং শক্নুয়াম্
তথাস্তু।’
কলিকাতা বেতারের মাধ্যমে অধ্যাপিকা চট্টোপাধ্যায় দুটি সংস্কৃত পত্র সম্প্রচার করেছেন। একটি হল আলোচ্য প্রবন্ধটি আর অন্যটি হল ‘সরস্বতী নদীরূপা দেবীরূপা’।