আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য চর্চার পথিকৃৎ: ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায় – ড. দেবদাস মণ্ডল
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের কাব্য ও কাব্যতত্ত্বের একজন প্রথিতযশা অধ্যাপিকা ছিলেন ড.ঋতা চট্টোপাধ্যায়। যিনি মূলত একালের সংস্কৃত জগতের মনীষীদের মনন, মেধা ও কৃতি অন্বেষণ নিয়ে আজীবন ব্যাপৃত ছিলেন। একটা সময় সংস্কৃত সাহিত্য বলতে মূলত প্রাচীন থেকে মধ্যযুগীয় সাহিত্য, শাস্ত্র চর্চাকে বোঝাত; অর্থাৎ সেই প্রাচীন সাহিত্য বেদ থেকে শুরু করে রামায়ণ, মহাভারত , বা তদবলম্বনে মহাকবিদের মহাকাব্য, কাব্য – দৃশ্য বা শ্রব্য -র খবরাখবর মোটামুটি একাদশ, দ্বাদশ শতক পর্যন্ত জানা যেত, কিংবা আরো পরবর্তীকালে সংস্কৃত আলংকারিক বা দর্শন – স্মৃতি – নিবন্ধকারদের সমালোচনা মূলক গ্রন্থ বা গ্রন্থরাজির কথা ধরলে প্রায় চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত জানা যেত। একালে সংস্কৃত যখন ‘মৃতভাষা’ হিসেবে উপেক্ষিত তখন সংস্কৃত নিয়ে নতুন করে কাব্য – সাহিত্য রচনা যেমন অভাবনীয় তেমনি তা অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য হিসেবে কালে – ভদ্রে যা একটু চর্চা হত তা কোন বিশেষ আলোচনা প্রসঙ্গে কিংবা বিক্ষিপ্ত দু’একটি সেমিনারে। কিন্তু আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য যে এযুগের সনামধন্য পণ্ডিত , কবি ,সাহিত্যিকদের নবনবোন্মেষশালিনী প্রতিভার আলোকে চির ভাস্বর বা চলমান হয়ে আছে এবং সকলের অলক্ষ্যে অন্তসলিলা ফল্গুধারার ন্যায় তা নানা শাখা-প্রশাখায় ক্রমশ বিস্তার লাভ করে চলেছে, যা অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের 20th Century Sanskrit Literature: A Glimpse into Tradition and Innovation, আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য (1910-2010) ছোটগল্প ও নাটক, বা আধুনিক সংস্কৃত কাব্য: বাঙালী মনীষা –
শতবর্ষের আলোকে প্রভৃতি গ্রন্থ ছাড়া জানা সম্ভব হত না।
আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যে ( প্রকাশিত: 2012 ) মূলত উনিশ-বিশ-একুশ শতকের সংস্কৃত ছোটগল্প, নাটক – ঐতিহাসিক নাটক , জীবনীমূলক নাটক, সমসাময়িক সমস্যামূলক নাটক, প্রাচীন সাহিত্য – রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, কিংবদন্তী উপাখ্যান অবলম্বনে নাটক -এর বিষয়বস্তুর বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়েছে। একটা সময় সংস্কৃত সাহিত্যের বিষয়বস্তু মূলত-রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের কাহিনি অবলম্বনে রচিত হত,
কিন্তু ঊনবিংশ, বিংশ, একবিংশ শতকের কবি-মনীষীরা শুধু প্রাচীন সাহিত্য অবলম্বনে তাঁদের ছোটগল্প,নাটক, উপন্যাস, খণ্ডকাব্য বা মহাকাব্যের বিষয়বস্তু উপস্থাপনে সীমাবদ্ধ থাকেন নি, ভাবনাচিন্তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যে সাম্প্রতিক বা চিরকালের সামাজিক সমস্যা, রাষ্ট্রিয় সমস্যা, সাম্প্রদায়িকতা, বেকার সমস্যা, সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি, পণপ্রথা, নারীনির্যাতন ,পরিবেশ দূষণ,
মনুষ্যত্বের অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট প্রভৃতি সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ একালের কবি-সাহিত্যিকদের সংস্কৃত সাহিত্যের বিষয় শুধু প্রাচীন ঐতিহ্য নয়,সেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে তা অধ্যাপিকা চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা থেকে সম্যক উপলব্ধি হয়। আধুনিক সংস্কৃত কাব্য: বাঙালী মনীষা:শতবর্ষের আলোকে ( প্রকাশিত : 2018 ) – অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের মুখ্যসম্পাদনায় এই গ্রন্থে রামায়ণ , মহাভারত, পুরাণ আশ্রয়ী মহাকাব্য, চরিতাশ্রয়ী মহাকাব্য, খণ্ডকাব্য বা গীতিকাব্য, অনুবাদকাব্য ও কবিপরিচিতি এবং পরিশেষে সম্পাদকমণ্ডলীর পরিচয় প্রদত্ত হয়েছে।
ড. চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃ। তাঁর দেখানো পথেই নতুন প্রজন্মের গবেষকেরা এখন আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে খুব উত্সাহী হয়েছেন। কিন্তু অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের কাছে এই কাজ অত্যন্ত সহজ সরল ছিল না। ঋতা চট্টোপাধ্যায় যখন এই কাজে ব্রতী হয়েছিলেন তাঁর কাছে এই কাজ নেহাত অত সহজ সরল ব্যাপার ছিল না। তাঁর অনেক অদম্য প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, সাধনা, সংযম, পরিশ্রম, ত্যাগ, ধৈর্য এই মহতী কাজের নেপথ্যে রয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্যের নতুন নতুন রত্ন ভাণ্ডারের সন্ধানে তিনি সংস্কৃত সাহিত্য পরিষৎ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ সহ বহু পুরাতন গ্রন্থাগারে যেমন রুটিন অনুসারে যাতায়ত করেছেন, বহু পত্র-পত্রিকা অন্বেষণ করেছেন, তেমনি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে একের পর এক কবি-পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে গেছেন, শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি বার্তালাপ করেছেন, তাঁদের পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, ভাবনাচিন্তা অবগত হয়েছেন, তাঁদের অমূল্য পাণ্ডুলিপি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেছেন, একেবারে শিক্ষানবিশের ন্যায় খাতা কলম নিয়ে সেখান থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যসংগ্রহ করেছেন, ফটো নিয়েছেন, পরিশেষে সেই কৃতবিদ্য পণ্ডিতবেষণা প্রসূত নী প্রতিভার অদের লেখাগুলি প্রচারের আলোকে নিয়ে আসা, সেগুলি নিয়ে নতুন করে চর্চা করা বা প্রকাশ করা প্রভৃতি নিজস্ব পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেছেন। ড. চট্টোপাধ্যায়ের এইসব অভিনব চিন্তাভাবনা শুনে কবি-সাহিত্যিক পণ্ডিত মহাশয়েরা অত্যন্ত অভিভূত হয়েছেন, উত্সাহ দেখিয়েছেন। কারণ ঐসব পণ্ডিত মহাশয়রাও হয়তো তখনো পর্যন্ত ভেবে উঠতেই পারেন নি যে তাঁদের এই অকৃত্রিম সৃষ্টিগুলির শেষ পরিণতি বা প্রকাশের উপায় কী হবে? সেক্ষেত্রে তাঁদের অত্যন্ত স্নেহের পাত্রী, প্রিয়দর্শিনী, বিদুষী ঋতা যে এভাবে ঈশ্বরের কোন দূত হিসাবে এগিয়ে আসবেন, তাঁদের এতদিনের জমানো সৃষ্টিসম্ভারকে জনসমক্ষে প্রচারের আলোকে নিয়ে যাবেন বা প্রকাশের ভার নেবেন তা জেনে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন, তাঁরা তাঁর মত বিদুষীর পক্ষেই একাজ সম্ভব বলে তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা ও অকাতরে আশীর্বাদ করেছেন। অধ্যাপিকা চট্টোপাধ্যায়ের যেমন ছিল মেধা, রচনাশৈলী, তেমনি ছিল গুরুজনদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভক্তি, অনুরাগ আর ছিল তাঁর একটি সুন্দর সহজসরল মন আর অকৃত্রিম আন্তরিকতা ও মানবিকতা বোধ। মানুষের সাধারণগুণগুলি তাঁর চেতনায় অসাধারণ ও অসামান্য হয়ে প্রকাশ পেত। প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর যেমন অপরিসীম শ্রদ্ধাশীল মনোভাব তেমনি আধুনিকতা বা সমকাল সম্বন্ধে তার ছিল খুরধার পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি। তাঁর সারস্বত সাধনা থেকে পোষাক-পরিচ্ছদ আচার-ব্যবহার পর্যন্ত সবকিছুই ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিপাটি- অর্থাৎ তিনি অত্যন্ত সৌখিন প্রকৃতির মানুষ। তাঁর একক ও সহযোগি সম্পাদনায় প্রকাশিত মহামূল্যবান গ্রন্থের সংখ্যা আঠাশটি।1 গবেষণা নিবন্ধের সংখ্যা প্রায় আশিটি। অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণাসমৃদ্ধ বক্তৃতা বা নিবন্ধসমূহ সংস্কৃত সাহিত্য অনুরাগিদের কাছে পরম পাথেয় ও অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি যদি এভাবে নিজের সারস্বত সাধনার একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে (প্রায় 45 বছর ধরে)আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ না করতেন তাহলে এই বিপুল পরিমাণ আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য সম্ভারের খবর অনেকটাই অজানা থেকে যেত। তাঁর সমগ্র রচনাবলীকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে–
- প্রাচীন সাহিত্য পর্যালোচনা ও গ্রন্থের সম্পাদনা ও অনুবাদ মূলক গ্রন্থ
- নির্দিষ্ট কালভিত্তিক আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যের সামগ্রিক পর্যালোচনামূলক গ্রন্থ
- বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী ও তাঁদের সারস্বত সাধনা সম্পর্কিত বিশেষ পর্যালোচনা
এছাড়াও অধ্যাপিকা চট্টোপাধ্যায়ের প্রাচীন ভারতের চিকিত্সা বিজ্ঞান, সংস্কৃত ও মুসলমানসম্প্রদায়, প্রাচীন ভারতের নারী নির্যাতনের প্রসঙ্গে তার অসামান্য নিবন্ধগুলি সবাইকে মুগ্ধ করে ও নতুনভাবে ভাবনার ইন্ধন যোগায়। এখন, গঙ্গাজলে গঙ্গা পূজার ন্যায় অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায় বিরচিত বিশিষ্ট কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী ও তাঁদের সারস্বত সাধনা সম্পর্কিত কয়েটি গ্রন্থের বিজ্ঞাপন নিবেদিত হচ্ছে-
ক. কাব্যমীমাংসা বিষ্ণুপদভট্টাচার্য, (প্রকাশিত-2010)
অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের পরমপূজ্য অধ্যাপক বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য্যেরর কাব্যমীমাংসার প্রাথমিক পর্বে তিনি একটি সুবিস্তৃত (82পৃ) ভূমিকার মাধ্যমে আচার্য্যের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করেছেন। এই নিবেদনে শুধু কাব্যমীমাংসার মূল্যায়ন করা হয়নি অধ্যাপক ভট্টাচার্য্যের সামগ্রিক রচনার প্রতি এক চৌম্বকীয় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। যেটা এপ্রজন্মের গবেষকদের নিকট এক বিরাট দিকদর্শন বলা যায়। প্রসংগত উঠে এসেছে – কাব্যশাস্ত্র রসাস্বাদনে বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য্যের অধ্যাপনার নৈপুণ্যের কথা, রসবোধের কথা, তাঁর ছাত্রজীবনে শোনা স্যারের মুখ থেকে শীলাভট্টারিকার – ‘যঃ কৌমারহরঃ … চেতঃ সমুত্কন্ঠতে’ ইত্যাদি শ্লোকের অপূর্বভঙ্গিতে অনুবাদ – ‘মনের মধ্যে হু হু করে উঠছে’ যেটা শুনে সেদিনে তাঁর তরুণ মনে এক নৈর্ব্যক্তি অনুভূতি জাগিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এ থেকে বোঝাযায় অধ্যাপক ভট্টাচার্য্যের অধ্যাপনার নৈপুণ্যে যেন নায়ক, স্রষ্টা কবি এবং সহৃদয় শ্রোতা এদের অনুভূতি পরস্পর মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য্যের প্রতিভা যে কত উন্নত মানের ছিল তার সাক্ষ্য বহন করছে তাঁর উন্নতমানের প্রবন্ধসমূহ, সম্পাদিতগ্রন্থ, টীকা – টিপ্পনী ও অণু-প্রবন্ধসমূহ- একথা অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের ‘নিবেদন’ থেকে সহজে উপলব্ধি করা যায়।
খ. মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের সারস্বত সাধনা: (প্রকাশিত, 2013)
এই গ্রন্থের শুরুতে মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের ব্যক্তিজীবন ও সারস্বত জীবন নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের জন্মগ্রহণ কাল, জন্মস্থান, বংশ পরিচয়, বিদ্যাচর্চা, বিবাহ, তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনযাত্রা এবং সারস্বত সাধনার বহু তথ্যসমৃদ্ধ পরিচয় পাওয়া যায়। সারস্বত সাধনার নিদর্শন হিসাবে শ্রী হরিদাস শর্ম্মার হরিদাস ‘সিদ্ধান্তবাগীশ’ এই উপাধি প্রাপ্তি ছাড়াও তিনি বিদ্যালংকার, শব্দাচার্য্য, কাব্যতীর্থ, স্মৃতিতীর্থ, সাংখ্যরত্ন, মহোপদেশক, আচার্য, শ্যামাসুন্দরী এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘মহামহোপাধ্যায়’, পদ্মভূষণ, ভারতীয় পণ্ডিত মহামণ্ডল থেকে ‘মহাকবি’, বঙ্গীয় পুরাণপরিষদ কর্তৃক ‘ভারতাচার্য্য’, কলিকাতা পৌরসভার দ্বারা ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ এ সম্মানিত হন। সরস্বতীর বরপুত্র হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশের অসামান্য পাণ্ডিত্য, মেধা, কর্মনিষ্ঠায় তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, তিনি জ্ঞানতপস্বী, কর্মযোগী, কবি, মনীষী, নাট্যকার, টীকাকার, অনুবাদক, প্রকাশক, সমাজসেবক হিসাবে প্রভূত যশ, খ্যাতি, শ্রদ্ধা লাভ করেন।
অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় মহামহোপধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের সংস্কৃত ও বাংলাভাষায় রচিত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত মহাকাব্য, খণ্ডকাব্য, নাটক, অলংকারশাস্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র ও টীকা-টীপ্পনীর একটা সুবিন্যস্ত সারণী প্রদানের পাশাপাশি সিদ্ধান্তবাগীশের মৌলিক কিছুগ্রন্থ- রুক্মিনীহরণম, কাব্যকৌমুদী, স্মৃতিচিন্তামণি প্রভৃতি গ্রন্থের উপর সামগ্রিক মূল্যায়ন করেছেন। এছাড়াও অধ্যাপিকা চট্টোপধ্যায় টীকাকার হিসেবে সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয়ের শিশুপালবধের ‘মাধুরী’ টীকা, মুদ্রারাক্ষস নাটকের ‘চাণক্যচাতুরী’ উত্তররামচরিতের ‘সর্বার্থবোধিনী, অভিজ্ঞানশকুন্তলের ‘অভিজ্ঞানকৌমুদী, দশকুমারচরিতের ‘কুমারসন্তোষিণী’ মেঘদূতের ‘চঞ্চলা’ নৈষধচরিতের ‘জয়ন্তী’ সাহিত্যদর্পণের ‘কুসুম প্রতিমা’ কাদম্বরীর ‘কল্পলতা’ মৃচ্ছকটিকের ‘বসন্তসুষমা’ মহাভারতের ‘ভারতকৌমুদী’ টীকা সমূহের প্রকাশনার স্থান, কাল সহ সেই সমস্ত টীকার উদ্দেশ্য ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য কাব্যতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যালোচনা করেছেন। এরপর নাট্যকার হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের ঐতিহাসিক তিনটি নাটক- শিবাজীচরিত, বঙ্গীয় প্রতাপ ও মিবারপ্রতাপ এর কাহিনির প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সমসাময়িকতার মেলবন্ধন নাট্যতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুপুঙ্খ বিচার করা হয়েছে। পরিশেষে সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয়ের রচিত PERSONALITY, PHILOSOPHY AND RELIGIOUS BELIEFS OF PT. HARIDĀSA নিবন্ধ এবং RUKMINIHARAAM, HARIDĀSA’S ERUDITION, MIVĀRPRATĀPAM প্রভৃতি গ্রন্থ সন্নিবেশিত হয়েছে।
গ. গুরুনাথ বিদ্যানিধি (1862-1931) ( প্রকাশিত, 2016)
এই গ্রন্থের সূচনা হয়েছে গুরুনাথ বিদ্যানিধির ব্যক্তিজীবন ও সারস্বতজীবনের বর্ণনা দিয়ে। গুরুনাথ বিদ্যানিধির সংক্ষিপ্তসার–ব্যাকরণে উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর আত্মপরিচয় ও বংশপরিচয় প্রদত্ত হয়েছে। গুরুনাথের পিতা- জয়চন্দ্র, আর মাতা ছিলেন উমাসুন্দরী দেবী। জন্মস্থান- অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার অন্তর্গত বিক্রমপুর পরগণার ধলচ্ছত্র গ্রাম, ইংরেজী 1862সালে। ঐ গ্রামের চতুষ্পাঠীতে তাঁর ‘কলাপ’ব্যাকরণ, কাব্য ও দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন, অতপর ঢাকা সারস্বত সমাজ থেকে উপাধি পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হলে ‘বিদ্যানিধি’ লাভ, যেটি তাঁর নামের শোভাবর্ধনকারী হিসেবে জুড়ে যায়। গুরুনাথ বিদ্যানিধি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কাব্যশাস্ত্র, ব্যাকরণ, দর্শন, স্মৃতি, পৌরহিত্য বিধিধশাখায় তাঁর ছিল অবাধ প্রবেশ। তাঁর অধ্যাপনার খ্যাতি মুখে মুখে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। টীকা-টিপ্পনী, অনুবাদ, কাব্য, নাটক, ব্যাকরণ, দর্শন, স্মৃতি, ছন্দ, অলংকার, কোষগ্রন্থ মিলিয়ে গুরুনাথ প্রণীত, সম্পাদিত ও প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ষাটের বেশি। এগুলির মধ্যে ব্যাকরণ গ্রন্থের সংখ্যা 16টি, ব্যাকরণে তাঁর ব্যুত্পত্তি অতিশয় প্রগাঢ় থাকার কারণে তিনি অপাণিনীয় ব্যাকরণ- কলাপ ব্যাকরণ, কাতন্ত্রগ্রন্থমালা, সংক্ষিপ্তসার, সারমঞ্জরী প্রভৃতি ব্যাকরণের বিশ্লেষণ, ব্যুত্পত্তি, টীকা-টিপ্পনী প্রণয়ন করেছেন। গুরুনাথ বিদ্যানিধি সম্পাদিত এবং প্রতিটি সম্পাদনায় উত্কৃষ্ট ভূমিকা সমন্বিত–রঘুবংশ, মেঘদূত, কুমারসম্ভব, ভট্টিকাব্য, কিরাতার্জুনীয়ম্, দশকুমারচরিতম্ প্রভৃতি যে অনবদ্য সংস্করণ হিসেবে পরিগণিত তা অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপধ্যায়ের কাব্যতাত্ত্বিক আলোচনা থেকে যথার্থ প্রতিপন্ন হয়।।
ঘ. শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ ও চিপিটক–চর্বণম (2018)
গ্রন্থটি অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় ও সৌম্যজিত সেন এঁর যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘চিপিটক-চর্বণম্’ গ্রন্থের প্রারম্ভে মহামহোপাধ্যায় শ্রীজীব ন্যায়তীর্থের ব্যক্তিজীবন আলোচিত হয়েছে। শ্রীজীব ন্যায়তীর্থের পিতা বিশিষ্ট পন্ডিত- পঞ্চানন তর্করত্ন। জন্মস্থান ও সময়কাল- উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার অন্তর্গত নৈহাটির ভাটপাড়া অঞ্চলে 1893সালের 26শে জানুয়ারি। এই শ্রীজীব ছিলেন পণ্ডিতপ্রবর অনন্তলাল ঠাকুরের শিক্ষা ও দীক্ষা গুরু দুইই। শ্রীজীবের ছিল অনিন্দ্যসুন্দর দেবদুর্লভ কান্তি-সুঠাম দেহ, বিদ্যাচর্চায় তিনি ছিলেন অলোকসামান্য মেধা ও মনীষার অধিকারী। তিনি অল্প বয়সেই কৃতিত্বের সঙ্গে কাব্যতীর্থ, ব্যাকরণতীর্থ, স্মৃতিতীর্থ, ন্যায়তীর্থ উপাধি লাভ করেন। বিদ্বত্সমাজে শ্রীজীব সরস্বতীর বরপুত্র, অনন্ত পুরুষ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি সাম্মানিক ডি.লিট, মহামহোপধ্যায়, ব্যাকরণ শিরোমণি, মহাকবি, দেশিকোত্তম, সংস্কৃতভারতী প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হন। শ্রীজীবের সারস্বত সাধনার কাল প্রায় সুদীর্ঘ ষাট বছর। শ্রব্যকাব্য, দৃশ্যকাব্য, স্তোত্রকাব্য, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, প্রশস্তিগাথার প্রভৃতিতে ছিল শ্রীজীবের অবাধ বিচরণ। শ্রীজীবের রচিত একটি তালিকা পাওয়া যায়2 – পাণ্ডববিক্রমম্ (মহাকাব্য), সারস্বতশতকম্ (চিত্রকাব্য), ঋতুচক্র-চংক্রমম্ (গীতিকাব্য) মহাকবি-কালিদাসম্, সাম্যসাগর-কল্লোলম্, শ্রীশঙ্করাচার্য-বৈভবম্, নাগনিস্তারম্, স্বাতন্ত্রসন্ধিক্ষণম্, বিবেকান্দচরিতম্, সিন্ধু-সৌবীর-সংগ্রমম্, শ্রীকৃষকৌতুকম্, রঘুবংশম্, কুমারসম্ভবম্ প্রভৃতি নাটক, মাধুরীসুন্দরম-প্রকরণ, বিধিবিপর্যাসম্, পুরুষপুঙ্গব-ভাণ, কৈলাশনাথবিজয়ম্, গিরিধরসংবর্দ্ধনম্– ব্যায়োগ এবং বিবাহবিড়ম্বনম্, চণ্ডতাণ্ডবম্, ভট্টসংকটম্, পুরুষরমণীয়ম্, ক্ষুতক্ষেমীয়ম্, শতবার্ষিকম্, চিপিটকচর্বণম্, রাগবিরাগম্, বনভোজনম্, রাম-নাম-দাতব্য-চিকিত্সালয়ম্, দরিদ্রদুর্দৈবম্, নষ্টহাসম্ প্রভৃতি প্রহসন এবং বেশকিছু প্রশস্তি কাব্যও আছে। এই সুবিস্তৃত তালিকায় এখানে শেষ নয়, উক্তগ্রন্থসমূহের বিষয়বস্তু, তাদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, কাব্যতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত পর্যালোচনা, তাদের আনুসঙ্গিক বিষয়বৈচিত্র প্রসঙ্গে শ্রীজীবের পাণ্ডিত্যের যথার্থ বিচার করা হয়েছে –শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ ও চিপিটক-চর্বণম্-এই গ্রন্থে। এর পরিশেষে শ্রীজীব ন্যায়তীর্থের চিপিটকচর্বণম্ এই প্রহসন এবং তার একটি সুরম্য বঙ্গানুবাদ অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রদত্ত হয়েছে।
ঙ. বিদুষী বঙ্গনারী রমা চৌধুরী (1912-1991) (প্রকাশিত: 2012)
এই গ্রন্থের প্রথমপর্বে রমাচৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনা ও দ্বিতীয়পর্বে রমা চৌধুরী রচিত মৌলিক নাটক, দর্শনগ্রন্থ ও দর্শনসম্পর্কিত প্রবন্ধ পর্যালোচনা সংযোজিত হয়েছে। এইগ্রন্থ থেকে জানা যায় রমাচৌধুরীর পারিবারিক জীবন, তাঁর জন্মস্থান, দেশ-বিদেশের বিদ্যাচর্চা প্রসঙ্গ, তাঁর দাম্পত্যজীবন ও কর্মজীবন। অসাধারণ, বাগ্মী বিদুষী রমা চৌধুরীর প্রতিভার দ্যুতি ও প্রজ্ঞার আলোয় বিশ শতকের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির জগত আলোড়িত হয়েছিল। সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজিতে তিনি প্রায় পঞ্চাশটি বই লিখেছিলেন। এরমধ্যে 20টি সংস্কৃত নাটক3, দর্শনগ্রন্থ, সংস্কৃত কবিতার অনুবাদ, অজস্র প্রবন্ধ। এসবের মধ্যে রমা চৌধুরীতে শঙ্কর–শঙ্করম্, নিবেদিত–নিবেদিতম্, যুগজীবনম্, মেঘমেদুর মেদিনীম্, পল্লীকমলম্, কবিকুল–ককিলম্, দেশদীপম্-এই নাটকগুলির প্রেক্ষাপট উল্লেখপূর্বক, নামকরণ বিচার, মৌলিকবৈশিষ্ট্য নির্দেশ, চরিত্রচিত্রায়ন ও কাহিনির নাটকীয়ত্বের মূল্যায়ন করা হয়েছে। অতপর রমা চৌধুরীর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনগ্রন্থ ও দর্শনসম্পর্কিত নিবন্ধগুলির মধ্যে নিম্বার্ক–দর্শন, বেদান্তদর্শন, গীতায় অদ্বৈতবাদ, বেদান্ত ও সুফী দর্শন, ….দশ বেদান্ত সম্প্রদায় ও বঙ্গদেশ, … দর্শন সম্পর্কিত নিবন্ধ- কর্মযোগ, গীতায় অদ্বৈতবাদ, পঞ্চম পুষ্প প্রভৃতি। পরিশেষে কয়েকটি নিবন্ধে- ‘অশ্বঘোষ’ সম্পর্কি একটি পুস্তিকায় রমা চৌধুরী বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে মহাকবি, দার্শনিক, অশ্বঘোষের বহুমুখী প্রতিভাকে ব্যক্ত করেছেন, ‘সংস্কৃত দূতকাব্য’ এই নিবন্ধে মেঘদূতের যথার্থ মূল্যায়ন এবং ‘অনুবাদ নৈপুণ্য’ কয়েকটি পরিচ্ছেদের মধ্যে ভূমিকায় অনুবাদের পদ্ধতি, কোন শ্রেণীর কবিতার অনুবাদে কোন গ্রন্থকে গ্রহণ করা হয়েছে তার নির্দেশ, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে নারী কবিদের পরিচয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পরিচ্ছেদে একচল্লিশ জন নারী কবির কবিতার অনুবাদ প্রদত্ত হয়েছে। রমা চৌধুরীর সমস্ত রচনায় মনশীলতা, সাবলীলতা, বৈদগ্ধ্যের ছাপ সুস্পষ্ট, সর্বত্র ভাষা ও ভাবের সারল্য, বৌদ্ধিক ও নান্দনিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের মতে- রমা চৌধুরী ছিলেন, ‘বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, Iconic thinker, প্রত্যয়ী প্রাবন্ধিক, প্রজ্ঞা-প্রোজ্জ্বল নাট্যকার, সমন্বয়বাদী দার্শনিক এবং সর্বোপরি মানবদরদী এক মহীয়সী নারী।’
চ. নিত্যানন্দ স্মৃতিতীর্থ (1923-2008) (A Centenary Commemoration Volume) (প্রকাশিত: 2022) অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় ও অধ্যাপিকা সোমা বসুর সম্পাদনায় নিত্যানন্দ স্মৃতিতীর্থের শতবর্ষ স্মারক এই সংকলিত নিবন্ধগ্রন্থের শুরুতে অধ্যাপিকা চট্টোপাধ্যায় পন্ডিত নিত্যানন্দ স্মৃতিতীর্থের ব্যক্তিগত ও সারস্বত জীবন নিয়ে অতি উত্কৃষ্টমানের একটি সুবিস্তৃত নিবন্ধ প্রণয়ন করেছেন। তাঁর নিবন্ধ থেকে জানা যায় নিত্যানন্দের পরিবারের আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশের যশোর জেলায়। ফরিদপুরে মামার বাড়িতে 1923 সালে 10ই এপ্রিল নিত্যানন্দ পণ্ডিতের জন্ম। তাঁর পিতা পণ্ডিত রামগোপাল মুখোপাধ্যায় স্মৃতিরত্ন এবং মাতা দীনতারিণী দেবী। পুত্রের শৈশবেই রামগোপালের কলিকাতায় আগমন এবং হাওড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস। কলিকাতা ও হাওড়ায় একাধিক চতুষ্পাঠীতে পিতার সান্নিধ্যে ও তত্ত্ববধানে কাব্য, ব্যাকরণ, ন্যায়, বৈশেষিক, পুরাণ ও দর্শনে ব্যুত্পত্তি অর্জন করেন ও তীর্থ উপাধি প্রাপ্ত হন। নিত্যানন্দ স্মৃতিতীর্থের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, কর্মজীবন ও সারস্বত জীবনের বহু তথ্য এই গ্রন্থ থেকে জানা যায়। তিনি ছিলেন হাওড়া সংস্কৃত সামাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। নিত্যানন্দ স্মৃতিতীর্থ রামকথা অবলম্বনে এগারোটি নাটক, মহাভারতের আখ্যান অবলম্বনে বারোটি নাটক, পুরাণকাহিনি অবলম্বনে সতেরোটি নাটক, উপনিষদ্ ভিত্তিক দুটি নাটক, লৌকিক আখ্যান অবলম্বনে ছয়টি নাটক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মনীষীদের চরিত্র অবলম্বনে এগারোটি নাটক, পণ্ডিত প্রকাণ্ড বা সারস্বত সাধকদের কীর্ত অবলম্বনে আটটি নাটক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জাতীয়তাবাদীদের দেশপ্রেম অবলম্বনে ছয়টি নাটক, জনপ্রিয় প্রচলিত কাহিনি অবলন্বনে দুটি নাটক এছাড়াও মহাকাব্য, পুরাণ, সামাজিক ও সমসাময়িক সমস্যা, সংস্কৃতের দুরবস্থা নিয়ে অসংখ্য নাটক এবং রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র প্রভৃতি মনীষীদের রচনার ভাষান্তর করেছেন। অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় নিত্যানন্দ স্মৃতিতীর্থের ঐসমস্ত নাটকগুলির উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করে নাট্যকারের প্রতিভার উত্কৃষ্টতা মূল্যায়ন করেছেন।
এভাবে দেখাযায়, অধ্যাপিকা চট্টোপাধ্যায় একালের কবি, সাহিত্যিক, পণ্ডিতদের সংস্কৃত রচনাসমূহের একেবারে পুঙ্খানুপুপুঙ্খ তথ্যনির্দেশ করে, সেগুলির বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট, কাব্যতত্ত্ব, ঐহিহাসিকত্ব প্রভৃতি বিচার করেও নতুন প্রজন্মের গবেষকদের গবেষণাকার্যের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছেন এবং আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যানুরাগিদের নিকট অপরিমেয় রসদের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর এই কাজের ক্ষেত্রে তিনি যাঁদের কাছ থেকে যেভাবে, যেটুকু তথ্য পেয়েছেন, তিনি বন্ধু হন বা আত্মীয়, বয়সে ছোট হন বা বড় হন সকলের কাছে অকুণ্ঠচিত্তে ঋণ স্বীকার করেছেন, চির কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। আমাদের কাছে এটা এইকারণেই শিক্ষণীয় যে আমারা দিনে দিনে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ছি। উপকারীর উপকার করা ত দূরের কথা, অপকার করতেও মনে বিন্দুমাত্র সংকোচ জাগে না। সেখানে ঋতা চট্টোপাধ্যায় যে কাজ করেছেন তিনি কী সব তাঁর নিজের জন্য করেছেন? তাহলে কী দরকার ছিল এত পরিশ্রমের? এত তথ্যসংগ্রহের? এত কৃতজ্ঞতা স্বীকারের? আর রাতের পর রাত জেগে অসুস্থ শরীরেও নিজের সারস্বত সাধনায় নিজেকে নিমর্জিত রাখতে? আসলে পৃথিবীতে মাঝে মাঝে এমন এক এক জন মানুষ আসেন যাঁরা সবসময় আত্মচিন্তায় নিমগ্ন থাকেন না, ভবিষ্যত্প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে তাঁরা কিছু কাজ করে যেতে যান, অনেকসময় সমসাময়িক কালে তাঁর গুরুত্ব হয়তো বোঝা যায় না বা‘ তাঁর সুমহান কাজের যথার্থ মূল্যায়ন হয় না, বা সমাজে উপযুক্ত স্বীকৃতি পান ঠিকই কিন্তু সময় চলে গেলে, সেই মানুষটি চলেগেলে তাঁর গুরুত্ব, তাঁর কাজের গুরুত্ব, তাঁর দূরদর্শী ভাবনার গুরুত্ব সকলেই নতমস্তকে স্বীকার করতে বাধ্য হন, আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য জগতে অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় এমন একজন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। যাঁর গবেষণাপ্রসূত নিবন্ধ বা গ্রন্থরাজি ছাড়া আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে গবেষণা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর নতুন নতুন চিন্তাভাবনা, নতুন গবেষকদের গবেষণা কর্মে উত্সাহদান, হাতে ধরে কাজ শেখানোর মানসিকতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। অনেকের অনেকগুণ আছে ঠিকই, অনেক ভালো কাজও করেছেন এমন অনেক মানুষও আছেন কিন্তু তাঁদের খুঁজে পাওয়ার অথবা পুরস্কৃত করা লোকের বড়ই অভাব। আর গুণী লোকের গুণের কদর করে ক’ জনই বা বোঝেন বা স্বীকার করেন? আমাদের ঋতা দি, অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন গুণীজনদের সমাদরের সেই দুর্লভ বিজ্ঞাতাদেরই একজন। তিনি নিজে অত্যন্ত গুণীজন বলেই একালের সংস্কৃতজ্ঞ, গুণীমানুষদের কৃতিসমূহকে প্রচারের আলোকে আনাটাই যিনি নিজের জীবনের অন্যতম ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন, এমন সজ্জন, গুণীমানুষের অভাব কখনোই পূরণ হবে না। তিনি যেখানেই থাকুন আনন্দে থাকুন। প্রণাম।
1 ঋতা চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, রমা চৌধুরী, পৃ.15-17
2 ঋতা চট্টোপাধ্যায় ও সৌম্যজিত সেন সম্পাদিত, শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ ও চিপিটক-চর্বণম, পৃ. 9-10
3 Conversations 1st issue (September 2022), page 150