স্বপ্ন – রূপক বিশ্বাস
বর্ষার ঠিক আগের দু-তিন সপ্তাহ, আমার অসহ্য লাগে কলকাতায়। তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে না, কিন্তু বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমান থাকে সাংঘাতিক। ফলে দরদর করে ঘাম হয়। জামাকাপড় গায়ে দেওয়া মাত্রই, অন্তর্বাসগুলি ভিজে যায়। এই সময় রাস্তায় বেরোতে হলে, খুবই বিরক্ত হই আমি। এই রকম এক সকালে, আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম হনহন করে। আমার গাড়িটা পার্ক করা আছে, একটু আগে সল্ট লেকের একটা গলির ভেতর। হঠাৎ আমার দূর থেকে মনে হল, তমাল বসে আছে সামনের রদ্দির দোকানে, মানে যে সব দোকানে পুরোনো খবরের কাগজ, ভাঙাচোড়া জিনিসপত্র কেনাবেচা হয়। আমি তমালের পেছনটা দেখতে পাচ্ছিলাম। তার পাঞ্জাবিটা পুরো ভিজে গেছে ঘামে। তমাল, কলকাতার এক কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ছিল। কয়েক বছর আগে রিটায়ার করেছে। থাকে আমার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে, সল্ট লেকের প্রান্তে। বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোট। কিন্তু আমার বন্ধু স্থানীয়। আমি যখন নিউ টাউনে চলে আসি, তখন তার সঙ্গে আমার আলাপ হয় এক কমন ফ্রেন্ডের মাধ্যমে। ওর স্ত্রী সুমিতা, একটা সরকারি স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। সেও অবসর নেবে কয়েক বছরের মধ্যেই। একমাত্র ছেলে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে।
চা সিগারেটের বাইরে, তমালের একমাত্র নেশা বই কেনা। নতুন নয়, পুরোনো বই। মর্নিং কলেজ শেষ হওয়ার পর, ও প্রায় প্রতিদিনই কলেজ স্ট্রীটে ঢুঁ মারে। পুরোনো বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে এবং একটা দুটো কেনে। পুরোনো বইয়ের দোকানের মালিকেরা ভালই চেনে ওকে। ওকে কদাচিত, নতুন বই কিনতে দেখেছি আমি। প্রত্যেক বছর আমার জন্মদিনে ও একটা করে বই আমাকে উপহার দিত, সেগুলো অবশ্য নতুন বইই। তবে একবার ও আমাকে বেশ চমকে দিয়েছিল। সেবার আমার জন্মদিনের আগে, আমাকে ফোন করে বলল, ‘এবার আপনাকে দেওয়ার জন্য ২৫টা বই কিনেছি।’ আমি ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলাম, ‘করেছ কী। এত টাকা কেউ খরচা করে।’
‘ঘাবড়াবেন না। বইগুলো নতুন নয় পুরোনো।’
‘তা হলেও।’
‘তবে একটা সারপ্রাইজ আছে।’
জন্মদিনের দিন বইগুলো হাতে পেয়ে বুঝতে পারলাম সারপ্রাইজটা কী। ২৫টা এমন বই যেগুলো সত্যজিৎ রায়ের লেখা নয়। কিন্তু প্রত্যেকটার প্রচ্ছদ সত্যজিৎ রায়ের করা, যার মধ্যে জিম করবেটের ‘কুমায়নের মানুষখেকো চিতা’-র বিখ্যাত প্রচ্ছদও ছিল। সত্যজিৎ রায় ছিলেন আমাদের দুজনেরই শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার জন।
সল্ট লেকের ছোট ভাড়া বাড়ি থেকে তমাল যখন ফ্ল্যাট কিনল সল্ট লেকের গৌরব আবাসনে, তখন সে খুব খুশি হয়েছিল। নতুন ফ্ল্যাটে তিনটে শোওয়ার ঘর এবং একটা বসার ঘর। তিনটে শোওয়ার ঘরের একটায় স্বামী-স্ত্রী থাকত। তার ছেলে থাকত দ্বিতীয় শোওয়ার ঘরে। আর তৃতীয় ঘরটা তমাল ব্যবহার করত লাইব্রেরি ঘর হিসেবে। বেশ বড় বাইরের ঘরের একদিকটায় ছিল ডাইনিং স্পেস আর অন্যদিকটা লোকজন এলে বসত। তবে ঘরটার মূল উপযোগিতা ছিল সান্ধ্যকালীন টিউশনের জন্য। তখন বিভিন্ন কলেজের প্রচুর ছাত্রছাত্রী পড়তে আসত তার কাছে। প্রথম দিকে লাইব্রেরি ঘরে বইগুলো থাকত পাঁচটা আলমারিতে। আর সেই ঘরের মাঝখানে ছিল একটা টেবিল, যার ওপর বই রেখে পড়াশুনা করা যেত। ক্রমে আলমারিগুলো ভরে গেল। দুএকটা করে বই জমা হতে লাগল টেবিলের ওপর। তারপর আস্তে আস্তে টেবিলটা ভরে যাওয়ার পর তারা স্থান পেতে লাগল মেঝের ওপর। পরে মেঝেও আর জায়গা রইল না। খুব সন্তর্পনে পা ফেলতে হত সেই ঘরে। তখনও পর্যন্ত বইয়ের প্রবেশ ঘটেনি বাইরের ঘরে। কারণ সেটা পরিষ্কার রাখতে হত সন্ধেবেলার টিউশনের জন্য। পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হল তমাল অবসর নেওয়ার পর। তার টিউশনের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অনেক কমে গেল। ততদিনে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিকতাও অনেকটা পাল্টে গেছে। কোন বিষয় বোঝার চেয়ে তাদের বেশি আগ্রহ নোটসের ব্যাপারে। ফলে পাঁচ জন ছাত্র-ছাত্রী এখন একজনকে স্পনসর করে পাঠায়। তার নোট ফটোকপি করে নেয় বাকি চারজন। শেষে শিক্ষার্থী সংখ্যা এত কমে গেল যে টিউশন ক্লাস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হল তমাল। আগে বাইরের ঘরটা সব সময় পরিস্কার থাকত। এখন বই ঢুকতে আরম্ভ করল সেখানেও। ধীরে ধীরে সেখানেও পা ফেলতে হত সাবধানে।
তার সংগ্রহের বইগুলোর সঙ্গে তমালের এক ধরণের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। কোন বইটা সে গনগনে রোদ্দুরের মধ্যে কিনেছিল আর কোনটা ঝরঝর বারিধারার মধ্যে কিনেছিল, কোন দুস্প্রপ্য বই খুব সস্তায় কিনেছিল আবার কোনটা লোভে পড়ে গিয়ে একটু বেশি দামে কিনেছিল, সব তার মনে থাকত। তাছাড়া আরো এক ধরনের বই সে আমায় মাঝে মাঝে দেখাত। হয়ত কোনো বিখ্যাত কবি বা লেখকের নিজস্ব সংগ্রহের বই, যাতে তাঁর নিজের নাম লেখা আছে অথবা তিনি কাউকে নাম লিখে উপহার দিয়েছিলেন যে কবিতার, গল্পের বই অথবা উপন্যাস, সেগুলো সব চলে এসেছে ফুটপাতের দোকানে, যেখান থেকে সে সংগ্রহ করেছে সেগুলো। একবার সে আমায় একটা কবিতার বই দেখিয়েছিল, যেটি এক প্রেমিক প্রবর দিয়েছিলেন তাঁর প্রেমিকাকে। কিন্তু কোন কারণে সেটিও স্থান পেয়েছিল ফুটপাতের পুরোনো বইয়ের দোকানে। হয়ত দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল পরে।
যতদিন পর্যন্ত তমালের বইয়ের সম্ভার তার লাইব্রেরি ঘর এবং বাইরের ঘরের আলমারি এবং বুক-কেসের মধ্যে সীমিত ছিল, ততদিন কোন সমস্যা হয় নি। কিন্তু যে মুহূর্তে বাইরের ঘরটা ধীরে ধীরে গুদাম ঘরের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সুমিতা মৃদু অভিযোগ করা শুরু করল। আমি একদিন সন্ধেবেলা তমালদের বাড়িতে বসে চা খেতে খেতে বললাম, আমি শুনেছি এক দম্পতির মধ্যে এই চুক্তি হয়েছিল যে, বিয়ের পর স্বামী যতগুলি নতুন বই কিনবেন, তাঁর আগের সংগ্রহ থেকে ঠিক ততগুলি বই কাউকে দিয়ে দিতে হবে বা বিক্রি করে দিতে হবে। তুমি আজকের দিন থেকে তমালের সঙ্গে এই রকম একটা চুক্তি করতে পার। সুমিতা একবার আমার মুখের দিকে, আর একবার তমালের মুখের দিকে দেখল। তমালের কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। আমি তখন তমালকে বললাম, আর একটা উপায় হতে পারে। তুমি তোমার সংগ্রহের একটা অংশ, যেগুলো তোমার এখন কাজে লাগে না, সেগুলো কোন লাইব্রেরিকে দান করে দিতে পার। তারা তোমায় দু হাত তুলে আশীর্বাদ করবে। এতে তমাল নিমরাজি বলে মনে হল। কয়েকদিন পরে আমি গিয়ে হাজির হলাম আমার এক পরিচিত লাইব্রেরিতে। ওই লাইব্রেরির যিনি ইনচার্য তিনি আমার কথা শুনে হেসে ফেললেন। আমি একটু অপ্রস্তুত হলাম। তিনি বললেন, আপনি দেখছি লাইব্রেরিগুলোর এখনকার হালহকিকত জানেন না। এখন কলকাতার ছোট এবং মাঝারি লাইব্রেরিগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। ইয়ং জেনেরেশনের কেউ মেম্বার হতে চায় না। যাঁরা এখনও আছেন, তাঁরা সকলেই প্রায় বৃদ্ধ। প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁদের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। অন্যদিকে বই রক্ষণাবেক্ষণ এবং লাইব্রেরি চালানোর খরচা বাড়ছে। ফলে যা বই আছে, তারই ঠিকমত যত্ন আমরা করে উঠতে পারছি না, সুতরাং নতুন বই নেওয়ার প্রশ্নই আর নেই।
এইসব ভাবতে ভাবতে, আমি রদ্দির দোকানে বসে থাকা, তমালের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ, সম্ভবত আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই, উঠে পড়ে ঘুরে দাঁড়াল তমাল। তাড়াতাড়ি আমার হাত ধরে নিয়ে গেল একটু দূরে। বলল, আপনি আমার বাড়িতে গিয়ে বসুন। চা-টা খান। আমি যাচ্ছি একটু পরেই। বলেই আবার ফিরে গেল রদ্দির দোকানে। আমি তমালের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। সুমিতা চায়ের কাপ আর কুঁচো নিমকির প্লেট সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে, বসল চেয়ারে, আমার বিপরীত দিকে। ‘তমাল কোথায়?’ আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম। ‘তা তো জানি না। সকালবেলা কোনরকমে বাজারটা নামিয়ে দিয়েই, দুটো বড় বড় থলে নিয়ে বেড়িয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছে বলে যায়নি।’ আমি একটু চিন্তিত হলাম। দুটো বড় বড় ব্যাগ নিয়ে রদ্দির দোকানে গিয়ে ও কী করছে? আমি রদ্দির দোকানে ওকে দেখতে পাওয়ার কথার উল্লেখ না করে চা খেতে খেতে সুমিতার সঙ্গে গল্প করতে লাগলাম। একটু পরেই তমাল এসে উপস্থিত হল। সে তখন হাঁপাচ্ছে। দুটো বড় বড় ভর্তি ব্যাগ নামিয়ে রাখল মেঝের ওপর। তারপর সোফায়, আমার পাশে ধপ করে বসে পড়ে সুমিতাকে বলল, আমাকেও একটু চা দাও। এক গ্লাস জলও দিও। তারপর দুটো ব্যাগ থেকে অনেকগুলো পুরোনো বই বার করে রাখল টেবিলের ওপর। আমি দু-একটা বই উল্টে-পাল্টে দেখে, অবাক হয়ে বললাম, এসব বই তুমি রদ্দির দোকানে পেলে? এগুলোর তো প্রচুর দাম। তমাল বলল, জলের দরে পেয়ে গেলাম। তবে রদ্দিওয়ালাও অনেক লাভ করেছে, কারণ ও তো কিনেছে সের দরে।’
‘সের দরে! কোথা থেকে?’
‘সামনের বাড়ির মিসেস রায় বিক্রি করেছেন।’
‘মিসেস রায়! মিঃ রায় তো মারা গেছেন এই সেদিন!’
‘হ্যাঁ গতকালই তো ওঁর শ্রাদ্ধ ছিল। মিঃ রায়ের সংগ্রহে বাড়ি ভর্তি বই ছিল। কাজ-কর্ম মিটে যাওয়ার পর আজ সকালেই মিসেস রায় বইগুলো রদ্দিওয়ালাকে বিক্রি করেছেন সের দরে। আমি বাজার করে ফেরার সময় দেখি রদ্দিওয়ালা বইগুলো বাঁধা-ছাঁদা করছে। মিসেস রায়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে গেলেন।’
মিসেস রায় আমারও অপরিচিত নন। তমালদের বাড়িতেই কথা হয়েছে দু-চার বার। শিক্ষিত ভদ্রমহিলা। ভাল চাকরি করেন একটা। আমি বললাম, ‘ উনি সের দরে বিক্রি করার আগে, তোমার দু-চারটে পছন্দমত বই তোমাকে দিয়ে দিতে পারতেন।’
‘উনি যখন বইগুলো বিক্রি করছেন, তখন আমি বাজার যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল। কিন্তু উনি কিছু বলেন নি।’
‘তুমি নিজে থেকেও তো বলতে পারতে। উনি তো তোমার পরিচিত।’
‘আমার সঙ্গে ওঁর চোখাচোখি হয়েছিল। কিন্তু বইগুলোর প্রতি ওঁর চোখে যে ঘৃণা আমি দেখেছিলাম, তারপর আর কিছু বলতে সাহস পাইনি।’
আমি আর কিছু বললাম না।
এরপর প্রকৃতির নিয়মে বর্ষাকাল এল। তাপের প্রদাহ কমল। একদিন সন্ধেবেলা আমি তমালদের বাড়ি যাচ্ছিলাম। যাওয়ার আগে বাড়ির জানলাগুলো ভাল করে বন্ধ করে গেলাম। এখন যে কোনদিন, যে কোন সময়ে, বৃষ্টি নামতে পারে। তমালদের বাড়ি পৌঁছনোর খানিকক্ষণ পরেই প্রবল ঝড় উঠল। তমালের ছেলের ঘরের জানলা দিয়ে একটা পার্ক দেখা যায়। সেদিকে চোখ রাখতেই বুঝতে পারলাম ঝড়ের তীব্রতা। আমাদের চোখের সামনেই একটা বিশাল গাছ উপড়ে পড়ে গেল। প্রায় ঘণ্টা খানেক চলল ঝড়ের তাণ্ডব। তারপর শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি একটু কমলে টিভির সিগন্যাল আবার এল। তখন আমরা বুঝতে পারলাম সারা কলকাতা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। তখনো ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। আমি আর তমাল ছাতা নিয়ে বের হলাম, বাইরের অবস্থা দেখতে। তমালদের আবাসনের গেটের ঠিক সামনে একটা বিশাল গাছ পড়েছে। সেটাকে না সরালে গাড়ি বের করা অসম্ভব। আবাসনের সিকিউরিটির লোকেরা বলল যে, তারা পুরসভার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারা বলছে যে, কলকাতায় প্রচুর গাছ পড়েছে। কাল সকালের আগে কিছু করা যাবে না। তমাল এবং সুমিতার অনুরোধে, আমি সেদিন রাত্তিরে ওদের বাড়িতে থেকে গেলাম। বর্তমানে ফাঁকা থাকা, ওদের ছেলের ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা হল। এমনিতেই শুতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল, তার ওপর নতুন জায়গা বলে বোধহয় ঘুম আসতেও একটু বিলম্ব হল। ততক্ষণে ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। চারিদিক শান্ত হয়ে গেছে। তবু মাঝ রাত্তিরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। প্রথমে মনে পড়ল, আমি আজ নিজের বিছানায় শুয়ে নেই। কিন্তু এ ছাড়াও একটা অস্বস্তি হচ্ছে। সেটা কী, ঠিকমত বুঝতে পারছিলাম না। চুপ করে শুয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। মনে হচ্ছে, পাশের ঘরে কে যেন চলাফেরা করছে সন্তর্পনে। সত্যি কি পাশের ঘরে, যেটা তমালের লাইব্রেরি ঘর, তাতে কি কেউ ঢুকেছে? নাকি পুরোটাই আমার মনের ভুল। এই সময় একটা আওয়াজ হল। মেঝের ওপর স্ট্যাক করে রাখা বই ধাক্কা লেগে মেঝের ওপর পড়ে গেলে, যে রকম আওয়াজ হয়, অনেকটা সেই রকম। এবার আর কোন সন্দেহ নেই, তমালের ঘরে কেউ ঢুকেছে। কিন্তু কে সে? তমাল ঢুকলে আলো জ্বালাত নিশ্চয়ই, কিন্তু ঘর তো অন্ধকার। সুমিতা শোওয়ার সময় আমাকে একটা টর্চ দিয়েছিল, রাতে উঠলে দরকার লাগতে পারে, এই ভেবে। আমি সেটাকে হাতে নিয়েই উঠে পড়লাম। কিন্তু সেটাকে না জ্বালিয়েই পাশের ঘরে গেলাম। খোলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, আমি ঘরের ভেতরটা দেখলাম। কেউ নেই। ফিরে আসব ভাবছি, এমন সময় আমার চোখ গেল ঘরের মাঝের টেবিলের দিকে। ততক্ষণে অন্ধকারটা চোখে অনেকটা সয়ে গেছে। একজন লোক বসে আছে, টেবিলে মাথা রেখে। আমি ধীরে ধীরে, মেঝের দিকে নজর রেখে, সাবধানে বইয়ের স্তূপ এড়িয়ে, টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তমাল টেবিলের ওপর মাথা রেখে বসে আছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম। আপাতদৃষ্টিতে তমাল সুখী লোক। রাতের অন্ধকারে তার এভাবে বসে থাকার কারণ কী? আমি তমালের কাঁধে হাত রাখলাম। সে চমকে উঠে মুখ তুলল। আমিও চমকে উঠলাম। তমালের চোখ ছলছল করছে। আমাকে দেখে তাড়াতাড়ি হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ পুঁছে বলল, ‘কথা বলবেন না, দরজা খোলা আছে। কথার শব্দে সুমিতা উঠে যেতে পারে।’ আমি যে ঘরে শুয়েছিলাম, সে ঘরে ঢুকে তমাল দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর আমাকে বলল, ‘আজকাল রোজ রাতে স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়, তারপর আর ঘুম আসে না।
’কী ধরণের স্বপ্ন দেখ?’
‘রোজ একই স্বপ্ন দেখি। আমার মৃত্যু হয়েছে। আর সুমিতা আমার শ্রাদ্ধের পরের দিনই, আমার সমস্ত বই সের দরে বিক্রি করে দিচ্ছে।’
*
লেখক পরিচিতিঃ
ইঞ্জিনিয়ার। যাদবপুর। কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন।