২০২৪-এর পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ – স্বাতী পারেখ

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ এক বিশেষ মহাজাগতিক ঘটনা। মানুষের জীবনযাপনের কেন্দ্র‌স্থলে আছে সূর্য। যুগের পর যুগ মানুষ দেখেছে সূর্যের উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন, আর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার, রাত। অন্ধকারের অজানার ভয় মানুষকে আতঙ্কিত করত, ভীত করত। আর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব অন্ধকার, সব ভয়ের হত অবসান। সূর্য‌ই জীবনের উৎস। কাজেই দিনদুপুরে যদি সেই ভাস্বরজ্যোতি নিভে গিয়ে চারিদিক অন্ধকার হয়ে যায় তখন তা পার্থিব মানুষদের কাছে ভয়ানক অশুভ অমঙ্গল‌কর ঘটনা বলে প্রতীত তো হবেই। কিন্তু কী কারণে দিন-দুপুরে সূর্য উধাও হয়ে যেত? বিজ্ঞান চর্চায় মানুষ জেনেছে এর রহস্য। গ্রহণের ফলেই সূর্যের জ্যোতি কিছু সময়ের জন্য আচ্ছাদিত হয়ে যায়।

তাহলে গ্রহণ কী ? ‘গ্রহণ করা’ বা ‘গ্রাস করা’ই হল গ্রহণ।  যে বস্তুটি  অন্য বস্তুটিকে আড়াল করে তাকে বলে গ্রহণকারী আর যে আড়ালে চলে যায় সে হল গ্রহণকৃত বস্তু। একটি মহাজাগতিক বস্তুর উপর যখন অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ছায়া পড়ে, সেই  ঘটনাকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে বলে ‘গ্রহণ’।


সূর্যগ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী; তাদের প্রচ্ছায়া ও উপচ্ছায়া। সূর্য হল নক্ষত্র, পৃথিবী হল গ্রহ আর চন্দ্র হল উপগ্রহ। পৃথিবী ও চন্দ্রের নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলোতই তারা আলোকিত। সূর্যের চারিদিকে উপবৃত্তাকারে ঘোরে পৃথিবী, আবার পৃথিবীর চারিদিকে উপবৃত্তাকারে ঘোরে চাঁদ। এ ছাড়াও পৃথিবী ঘুরে চলেছে নিজেরই চারদিকে, লাট্টুর মতো— চব্বিশ ঘন্টায় একবার। এর ফলেই হয় দিন আর রাত। আর চাঁদ আবার ঘোরে পৃথিবীর চারপাশে, পুরোটা ঘুরে আস্তে লাগে প্রায় এক মাস (আসলে ২৮ দিন)। এর ফলে পৃথিবী থেকে চাঁদের কতটা দেখা যাবে তা পালটাতে থাকে, সৃষ্টি হয় চন্দ্রকলার। হয় পূর্ণিমা আর অমাবস্যা। নিজের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে হাজির হয়, তখন অমাবস্যা হয়। তখন দিনের বেলায়, সারাদিন চাঁদ আকাশে থাকে। রাতে সূর্য আর চাঁদ একই সঙ্গে অস্ত যায়, সারা রাত চাঁদকে দেখা যায় না। তেমনই, পূর্ণিমার সময়  সূর্য আর চন্দ্রের মাঝে অবস্থান করে পৃথিবী। সেদিন পৃথিবীর একদিকে চাঁদ, অন্যদিকে সূর্য — পরস্পরের বিপরীতে এদের অবস্থান। পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছে, তখন পুবের আকাশে চন্দ্রের উদয় হচ্ছে। গোটা রাত জুড়ে সে বিরাজ করে আকাশে।

চাঁদের যেদিকে সূর্য অবস্থান করে তার বিপরীতে চাঁদের ছায়া পড়ে। কোনো কোনো অমাবস্যায় সে ছায়া পৃথিবীর ওপর এসে পড়ে। তখন সেই ছায়ার মধ্যে থাকা পৃথিবীর সেই অঞ্চল থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। এই ছায়া হল প্রচ্ছায়া বা umbra, যা সূর্য‌কে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে । পৃথিবীর ওপর চাঁদের আর এক ধরনের ছায়া হল উপচ্ছায়া বা penumbra। উপচ্ছায়া কেবল সূর্যের একটা অংশকে আড়াল করে। পৃথিবীর যে সব অঞ্চলে চাঁদের উপচ্ছায়া পড়ে, সেসব অঞ্চল থেকে সূর্যের আংশিক গ্রহণ দেখা যায়। আবার বিশেষ অবস্থায় চাঁদের প্রচ্ছায়া‌র শীর্ষ‌বিন্দু যখন পৃথিবী পৃষ্ঠতলের কিছুটা ওপরে অবস্থান করে তখন ঐ প্রচ্ছায়া‌র উল্টো শঙ্কু পৃথিবীর ওপর পড়ে এবং পৃথিবীর সেই সব অঞ্চল থেকে সূর্যের বলয় গ্রাস দেখা যায়। সেখানে সূর্যের কেন্দ্রীয় অংশ আচ্ছাদিত, কিন্তু বাইরের প্রান্তিক অংশ থেকে আলো পৃথিবীতে আসছে— তাই সূর্য‌কে দেখায় যেন একটা আলোর চুড়ি বা বলয়ের মতো।


এই হল সূর্যগ্রহণের রহস্য। এই সূর্যগ্রহণের প্রভাব পৃথিবীর ওপর পড়ে। কিছুক্ষণের জন্য প্রকৃতিরাজ্যে পরিবর্তন ঘটে। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য যখন চাঁদের আড়ালে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যায়, তখন দিনের বেলার এই আঁধার এক রহস্যে ঢাকা থাকে। কিছুক্ষণ পর যখন চাঁদের গ্রাস থেকে সূর্য মুক্ত হয়, সেই মুহূর্তটার সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। ছায়ায় আড়াল সরে যাওয়ার সময়ে সূর্যের কিরণ যেন হীরের আংটির মতন ক্ষণিকের জন্য ঝলসে ওঠে। তারপর চারিদিকে আলোর বলয়, অসাধারণ সে দৃশ্য!

আমরা দেখি সূর্য গ্রহণ হয়, চন্দ্র গ্রহণ হয়। সূর্য‌গ্রহণে দিনে নেমে আসে রাতের আঁধার। ভয় থেকেই মানুষ গ্রহণকে অশুভ মনে করে, প্রকৃতির রোষ বলে ভাবে। গ্রহণ নিয়ে সমাজে কুসংস্কারের অন্ত নেই। অনেক মানুষই গ্রহণ চলাকালীন খাদ্য গ্রহণ করে না, প্রায় কোনো কাজ‌ই করে না । গ্রহণ শেষে পূজা-পার্বণ, দান-ধ্যান করে। ১৯৮০ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি যখন কলকাতার কাছেই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল, তখন সরকার থেকেই জনসাধারণের উপর নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। যে দুর্লভ মহাজাগতিক ঘটনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল কলকাতাবাসীর, তা সম্পূর্ণ নষ্ট হল কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের জন্য। কিন্তু এখন দৃষ্টিভঙ্গি‌র বদল হয়েছে। এখন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে সাধারণ মানুষ অতীব উৎসাহী। দেশ-দেশান্তরে ছুটে গিয়ে তাঁরা এই মহাজাগতিক নৈসর্গিক দৃশ্যের সাক্ষী হতে চান।

১৯৯৫ সালের ২৪শে অক্টোবর ফলতা, ডায়মন্ডহারবার থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল; তখন বিজ্ঞানী, বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে  যাদের আগ্রহ তারা এবং সাধারণ লোক‌ও এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। দুর্ভাগ্য‌বশতঃ আমরা তখন উত্তর পূর্বাঞ্চলে শিলং শহরে ছিলাম। আমাদের ছেলেরা তখন ছোট। একটু বড় হতে তাদের, বিশেষ করে ছোট ছেলে পুলস্ত্য-র গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে বেলুড় বিদ্যামন্দিরে বি.এস.সি পড়াকালীন পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখতে সে ট্রেনে করে কিষাণ‌গঞ্জে গিয়েছিল। আমরাও গিয়েছিলাম। সকালবেলা সূর্যগ্রহণ হবে। কিন্তু রাত থেকে তুমুল বৃষ্টি। ভোরে স্টেশনে নেমে বৃষ্টি দেখে ছেলে হতাশ হয়ে পড়ল। বৃষ্টির জলের সঙ্গে ওরও চোখে জল। ঈশ্বরের বুঝি দয়া হল ছেলেটি‌র প্রতি। কিষাণ‌গঞ্জে রেলব্রীজের উপর যখন আমরা দাঁড়িয়ে, তখন হঠাৎই গ্রহণ শুরু হওয়ার মিনিট দশেক আগে মেঘ স‍রে গিয়ে সেই অলৌকিক দৃশ্য ক্ষণকালের জন্য দৃশ্যমান হল। ওখানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয়েছিল সূর্যোদয়ের ঘন্টা তিনেক পরে। কিষাণগঞ্জ স্টেশনের রেলব্রীজের উপর থেকে দেখা সেই দৃশ্য আজ‌ও মনে পড়ে। এ আঁধার মেঘে ঢাকা আঁধার নয়, এ এক অপার্থিব আঁধার। চারিদিক কেমন মায়াময় হয়ে উঠেছিল। পাখিরা ডাকতে শুরু করেছিল। ছোটকু‌র কাছে ছিল expose করা কালো x-ray plate, তার ভেতর দিয়েই তাকানো হল আংশিক গ্রহণে ঢাকা অচেনা আকারের সূর্যের দিকে, যা দেখতে হয়তো পঞ্চমীর চাঁদের মতো, পুরো গোলাকার নয়। আর যখন সূর্য পুরোপুরি ঢেকে গেল, চারিদিকে নেমে এল অন্ধকার, তখন সেই x-ray plate সরিয়ে খালি চোখেই সবাই তাকিয়ে রইলাম ঘন কালো রঙের সূর্যের পানে। আমাদের সঙ্গে সেদিন যে সব যাত্রী ছিলেন তারাও ছোটকুর‌ x-ray plate নিয়ে দেখলেন এই দৃশ্য।  সেবারে পূর্ণগ্রাসের সময়কাল ছিল চার মিনিট, আবহাওয়া হঠাৎ ভালো হ‌ওয়ার দরুণ তাই ঠিকঠাক দেখতে পেলাম। সেবারে পাটনা থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ ভালোভাবে দেখা যাবে বলে অনেকেই পাটনা গিয়েছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই মাহেন্দ্রক্ষণে মেঘ এসে যাওয়াতে সেখানকার মানুষ পূর্ণ‌গ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখতে পেল না। একেই বলে ভাগ্য!

পরবর্তী পূর্ণ‌গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখি ২০১৭ সালের ২১শে জুলাই, আমেরিকার টেনেসি রাজ্যের ন্যাশভিল থেকে। অপূর্ব সে অভিজ্ঞতা! তখন সন্দীপন মানে জ্যেষ্ঠপুত্র ন্যাশভিলে Vanderbilt University-তে PhD করছিল। তাই এবারে ন্যাশভিলে ওর বাড়ির কাছের একটা পার্কে গিয়ে আমরা চারজন একসঙ্গে মহাজাগতিক দৃশ্যটি দেখেছিলাম।

ছোট ছেলে পুলস্ত‍্য তখন কানপুর আইআইটিতে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করছে। নিজের আগ্রহে মহাকাশ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান আহরণ করেছে। সে সময়ে ওর কাছে দূরবীন ছিল না। আমেরিকায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ ধরনের চশমা জোগাড় হয়েছিল। ওখানকার অনেক সরকারি সংস্থা বা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিতরণ করা হয়েছিল, অনেক দোকানেও নামমাত্র মূল্যে পাওয়া যেত। নিকটবর্তী পার্কে গিয়ে সেই চশমার সাহায্যে আমরা খুব ভালভাবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখি। আসলে সেই চশমা দরকার আংশিক গ্রহণের কবলে পড়া সূর্যের দিকে তাকাতে, পূর্ণগ্রাসের সময়ে ওই চশমা চোখে থাকলে কিছুই দেখা যাবে না। ঠিক যেন সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনই দশা সেই সূর্যের, পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময়। বাড়ি থেকে ঝাঁঝরি নিয়ে এসে ঝাঁঝরির ভিতর দিয়েও খুব ভালভাবে সূর্য গ্রাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্তরে স্তরে দেখে অবাক হলাম। তাছাড়া পার্কে কয়েকজন টেলিস্কোপ লাগিয়ে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখছিলেন, আমরাও মাঝে মাঝে তাঁদের টেলিস্কোপে চোখ রাখছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ন‍্যাশভিলের রেখাদি (রেখা পট্টনায়ক), আলাবামার দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়। সকলে মিলে খুব হৈ হৈ করে সূর্যগ্রহণ দেখলাম। ধীরে ধীরে আলো কমে এল। মাঝদুপুরে রাতের অন্ধকার নেমে এল। পাখিরা ডাকতে শুরু ক‍রল। পার্কের লাইটগুলো আপনা থেকে জ্বলে উঠল। মুহূর্তের জন্য চারিদিক ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল। মুহূর্তে‌ই হঠাৎ আলোর ঝলকানি, ঢাকা পড়া সূর্যের চারিদিকে আলোর বলয়। মহাজাগতিক ম‍্যাজিক শেষ। সূর্যদেব ধীরে ধীরে আবার প্রকাশমান হতে থাকলেন। যতক্ষণ না পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশিত হলেন, আমরা পার্কেই বসে র‌ইলাম। আমেরিকা‌বাসীরা সূর্য গ্রহণের সময়টা (ন‍্যাশভিলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময়কাল ছিল দু থেকে আড়াই মিনিট) খুব উপভোগ করলেন। যেখানে আমাদের দেশের মানুষ সূর্যগ্রহণের সময় কিছু আহার করেন না, রান্না করা খাবার ফেলে দিয়ে স্নান করে নতুন করে রান্না করেন— সেখানে ওনারা পিকনিকের মতো খাবার প‍্যাক করে নিয়ে এসে সবাই খাওয়া দাওয়া করেন, coke খান, বাচ্চারা খেলা করে— যেন এক উৎসবের মেজাজ। আমাদের ন্যাশভিলবাসী বন্ধু সুন্দরমূর্তি এবং ওর স্ত্রী শান্তি ন‍্যাশভিল চিড়িয়াখানা থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখেছিল। সূর্য গ্রহণের সময়ে চিড়িয়াখানায় পশু-পাখিদের কিছু কিছু পরিবর্তন ওরা লক্ষ করতে পেরেছিল। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য একটা ব্যাপার।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ চাক্ষুষ করা নেশার মতো হয়ে যায়। পরবর্তী কোন স্থান থেকে দেখা যাবে তার জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে যায়। জীবদ্দশায় যেখানে যেখানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হবে সেখানে সেখানে ছুটে যাওয়ার নেশা চাপে। আমরাও সেদিন সবাই মিলে ঠিক করলাম আবার সবাই আমেরিকা‌য় আসব পরের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে।  আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিম অংশ ডালাস থেকে উত্তর পূর্বে নায়গ্রা পর্যন্ত ২০২৪-এর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পথ। মনে আশা, সেসময় আসা যেতেই পারে, বড় ছেলে সন্দীপনের পিএইচডি ততদিনে হয়ে যাবে, হয়তো বা সে এখানেই কোথাও থাকবে। ২০২৪-এর ৮ই এপ্রিল সত্যিই আমরা আমেরিকার ডালাসে এসে  কাছের একটা জায়গা থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখলাম, তবে আমাদের চারজনের মধ্যে তিনজন একসঙ্গে দেখলাম। সন্দীপন মুম্বাইয়ের স্কুলে পড়ায়, তাই আর যেতে পারল না। অবশ্য আমাদের যাওয়াটাও অনিশ্চিত ছিল। ২০১৭ সালে প্রদীপ পারেখ এক বছরের জন্য ভিসা পেয়েছিল। তারপর করোনা মহামারি শুরু হল। কোভিডের কারণে ভিসার আবেদন করে তার অ্যাপয়েন্টমেন্টের যে ডেট পাওয়া গেল তা হল ২০২৪-এর এপ্রিল মাসের শেষে। আর পূর্ণগ্রাস গ্রহণ হবে ৮ই এপ্রিল, ২০২৪। যাইহোক, অ্যাপয়েন্টমেন্টের ডেট পাওয়ার ব‍্যাপারে বারবার খোঁজ নিতে নিতে অবশেষে ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে একটা ডেট পাওয়া গেল। ভিসা পেতে আর বিশেষ সময় লাগল না। ইতিমধ্যে আমাদের ছোট ছেলে পুলস্ত‍্য (ছোটকু) চিলির ভালডিভিয়া শহরে গেছে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার জন্য। ফেব্রুয়ারি মাসটা চিলির গ্রীষ্মকাল। ঠিক হল গ্রীষ্মকাল চিলিতে কাটিয়ে এপ্রিলের প্রথমে আমরা আমেরিকায় চলে যাব, পূর্ব পরিকল্পনা মতো ডালাসে গিয়ে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখব। ছোটকু তো আগেই টিকিট কেটে রেখেছিল। কাজেই যথাসময়ে আমরা ডালাস পৌঁছে গেলাম। এখানেও দেখলাম আমাদের ন‍্যাশভিলের বন্ধু সুন্দরমূর্তির বদান্যতা। সূন্দরমূর্তির ভাগ্নে থাকে ডালাসে, তার বাড়িতেই আমরা অধিষ্ঠান করলাম।  ন‍্যাশভিল থেকে সুন্দর‌মূর্তিও চলে এসেছে। এমনকি ২০১৭ সালে সূর্যগ্রহণ দেখতে আমাদের বন্ধু সোমান আর জয়শ্রী হিউস্টন থেকে ন‍্যাশভিল এসেছিল, এবার ওরা এল হিউস্টন থেকে ডালাসে। এবারের পূর্ণগ্রাসের সময় কিছুটা বেশি। ছোটকু আবার হিসেব করে দেখেছে ডালাসের যে অংশ থেকে আমরা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখব তার সময়টা অন্য জায়গা থেকে কিঞ্চিৎ বেশি (চার মিনিট)।

ইতিমধ্যে ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুতে তাঞ্জাভুরের কাছে ছোটকু, মুচকু আর ওদের বাবা সূর্যের বলয়গ্রাস দেখেছে। আর ছোটকু ২০২১-এ চিলি থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আকাশ মেঘলা থাকায় ওর তখন পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখা হয়নি।

সত্যি বলতে কী, ২০২৪-এর আগে যে সব পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখেছি, মনে অত বেশি দাগ কাটে নি, এবার যতটা দাগ কাটল। চিলিতে ছোটকু‌র সঙ্গে তারা দেখা এবং গ্রহ-নক্ষত্র বিষয়ে কিছুটা মনোযোগী হ‌ওয়ার দরুণ‌ একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখার  আগে আমি ব্যাপারটা এত ভাল করে জানতাম না; কেমন একটা ভয়, রহস্য মনকে আচ্ছন্ন করে রাখত। একটু পড়াশুনা করার পর আর ছোটকুর সাহচর্যে এবারের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ আর‌ও মজাদার ও আকর্ষণীয় হল।

৬ই এপ্রিল আমরা দক্ষিণ আমেরিকার সান্টিয়াগো থেকে প্লেনে আটলান্টায় এলাম। সেখান থেকে আরেকটা প্লেনে ডালাস। ডালাস বিমানবন্দরে নেমে দেখি মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। এ বাবা, ডালাস থেকেই তো পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখার কথা। যদি মেঘের এই নমুনা হয় তাহলে তো পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখার পরিকল্পনা একেবারে ভেস্তে যাবে! আর দুদিন পরেই TSE (Total Solar Eclipse), যা নিয়ে সারা আমেরিকায় টিভিতে হইহই চলছে এক মাস ধরে। বিশেষ বিশেষ কিছু জায়গা চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে ভালোভাবে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাবে। টেক্সাসের ডালাস তার অন্যতম। তাই ৬ তারিখেই ডালাসের বিমানবন্দরে ভিড়, হোটেলে ভিড়। টিভিতেও চলছে নানা আলোচনা, বিশেষ করে আবহাওয়া নিয়ে । কিছু কিছু স্কুল সেদিন ছুটি দিয়েছে। কোনও কোনও স্কুল আবার স্কুল আবার ছাত্র-ছাত্রীদের এই মহাজাগতিক ঘটনা দেখাতে স্কুলেই বিশেষ ব্যবস্থাও করেছে ।

৬ই এপ্রিল বিমানবন্দরে সুন্দর‌মূর্তি আমাদের নিতে এল, গিয়ে উঠলাম ওর ভাগ্নে গুরুপ্রসাদের বাড়িতে। পরদিন ৭ই এপ্রিল ছোটকুও ডালাস এসে গেল। ছোটকু‌র কাকা-কাকিমা থাকে সান ফ্রানসিস্কোতে, ওরাও এসে গেল ডালাস। ওরা উঠেছিল আগে থেকে বুক করা একটা হোটেলে। সমানে কাকা-ভাইপোর আলোচনা চলছে, কোথায় কখন কীরকম পরিমাণ মেঘ থাকবে। সেই সব হিসেব-নিকেশ মেনে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া হবে কাছাকাছি এমন কোনো জায়গায় যেখান থেকে সূর্যগ্রহণ দেখার সুবিধা হয় ।

৮ই এপ্রিলের সকালে গুরুপ্রসাদের বাড়ির অঞ্চলে ঝকঝকে রোদ্দুর। এখানে দুপুর একটা থেকে শুরু হবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। আবহাওয়া দপ্তর বলছে বেলা এগারোটা থেকে আকাশ মেঘে ঢেকে যাবে আর তার পরে আছে ভারী বর্ষণ। সকালে রোদ্দুর দেখে মনে হল সবাই মিলে গুরুপ্রসাদের বাড়ির সামনে থেকেই তো গ্রহণ দেখলে হয়। ছোটকু স্থির করল, দুঘন্টা ড্রাইভ করে আর‌ও উত্তরপূর্ব দিকে অবস্থিত টেক্সাসের বোগাটা শহরে যাবে। অত‌এব ব্রেকফাস্ট খেয়ে গুরুপ্রসাদের বাড়ি বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজন। আমাদের চোখ সারাক্ষণ আকাশের দিকে। গাড়ি যত এগোচ্ছে তত মেঘের রাজ্যে ঢুকছি। ওর কাকা আর‌ও এগিয়ে গিয়েছিল, আকাশ দেখে ফোনে  সন্দেহ প্রকাশ করল, সত্যিই ছোটকু‌র সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা। ছোটকু শুধু বলল, ‘দ্যাখো না চুপ করে, কী ঘটে’। সত্যিই, ঘন্টাখানেক যাবার পর দেখি মেঘ সব উল্টো দিকে ধেয়ে চলেছে। কাকাও জানাল, ওরা সূর্যের মুখ দেখতে পেয়েছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

আমাদের গন্তব্য ছিল উত্তরপূর্ব টেক্সাসের ছোট্ট শহর বোগাটার (Bogata) একটা খোলা মাঠ। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল যেন মেলা বসেছে। কচি-কাঁচা, লোকজনের ভিড়। ফোল্ডিং চেয়ার, খাবার দাবার, পুষ্যি কুকুর ইত্যাদি নিয়ে সব হাজির। টুপি, রোদ চশমা আর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার স্পেশাল চশমা নিয়ে সকলে প্রস্তুত। ছোটকু‌র কাকা-কাকিমা ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে। ছোটকুও যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে গেল। আমিও এবার বেশ উত্তেজনা বোধ করলাম। ধীরে ধীরে এসে গেল সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত । সূর্যের গ্রাস শুরু হল। প্রথমে আংশিক গ্রহণ। বিস্কুটের কোনা কামড়ানোর মতো সূর্যের একটা অংশ যেন অদৃশ্য হল। যে যেমনভাবে পারে দেখছে। কেউ টেলিস্কোপ লাগাচ্ছে, কেউ বা দূরবীনে চোখ রাখছে, কেউ বা চোখে বিশেষ চশমা লাগিয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে দেখছে। গাছের নীচে পাতার ছায়ায় সূর্যের বিভিন্ন আকারের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেল। চাঁদের ছায়া সূর্যকে ঢাকা দিতে দিতে আর সামান্যই বাকি রেখেছে। বিশেষ চশমার ভেতর দিয়ে দেখছি, আর সব কিছু অন্ধকার, কেবল সূর্যটা দেখতে পাচ্ছি— যেন দ্বিতীয়া বা তৃতীয়ার এক ফালি চাঁদের মতো, যার রঙটা হলুদ-কমলা। এর পরই শুরু হবে সূর্যের পূর্ণগ্রাস, যা দর্শন করতে দূর দূরান্ত থেকে কত মানুষ জড়ো হয়েছে এখানে।  

আংশিক সূর্যগ্রহণের সময়ে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা সূর্য। লেন্সের ওপর লাগানো ছিল বিশেষ ফিল্টার।

এবার চারপাশে নেমে এল মায়াবি আঁধার। অন্ধকার আকাশে ফুটে উঠল একটা দুটো উজ্জ্বল তারা। পার্কের গাছে গাছে পাখিদের কলরোল, সে এক অনির্বচনীয় পরিবেশ। নিমেষে চরাচর ডুবে গেল যেন এক অলৌকিক অদৃশ্য  

কালো চাদরে, পরমুহূর্তেই আকাশে দেখা গেল হীরকদ্যুতি। আর কারো চোখে চশমা নেই, খালি চোখেই সকলে তাকিয়ে আছে কৃষ্ণবর্ণ সূর্যের দিকে। সকলেই বিস্ময়বিহ্বল আবেগে চিৎকার করে উঠল, ‘Oh my god!!’

আহা, কী দেখলাম! হীরকদ্যুতির ম্যাজিকের পর দেখা গেল আলোর বলয়; জ্যোতির্বলয়। কয়েক মিনিট পর কালো চাদর সরতে লাগল, ধীরে ধীরে সূর্য‌দেব আবার নিজস্ব ফর্মে ফিরতে লাগলেন। লোকজন‌ও ধীরে ধীরে পাততাড়ি গুটাতে লাগল। পূর্ণগ্রাসের প‍রবর্তী পর্যায়ে গাছের পাতার ফাঁকে ঘাসের ওপর সূর্যের প্রতিচ্ছবি বিপরীত ভাবে পড়তে থাকল। ক্যালিফোর্ণিয়া থেকে চার-পাঁচজনের একটি দল এসেছিল। আমাদের পাঁচজনের টেলিস্কোপ, বাইনাকুলার নিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখার কার্যবিধি দেখে কৌতূহলী হয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ করলেন, একসঙ্গে ছবি তোলা হল। সুদূর ভারতবর্ষ থেকে আর চিলি থেকে গ্রহণ দেখতে এসেছি শুনে বিস্মিত হলেন ওঁরা।


 পূর্ণগ্রাস গ্রহণ শেষ হয়ে যাবার পর এই অঞ্চলে মেঘ ঘন হয়ে এল, শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। এই মেঘেরা যেন এতক্ষণ আমাদের জন্যই জল না ঝরিয়ে অপেক্ষা করছিল। পরে শুনলাম, ডালাসের অন্য অনেক  অঞ্চল থেকেই মেঘ থাকার জন্য পরিষ্কার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায় নি। প্রচুর লোক প্রচুর খরচ করে নায়াগ্রা গিয়েছিল পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখবে বলে, কিন্তু তাদের হতাশ হতে হয়। গ্রহণের সময়টাতে সেখানে আকাশ ছিল গাঢ় মেঘে আচ্ছন্ন।  সত্যিই আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে এবং অবশ্যই ছোটকু‌র সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তাই আমরা নির্মেঘ আকাশে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের শুরু থেকে পর্যায়ক্রমে অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া ও শেষে ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ দেখিয়ে সূর্য‌দেবের পুনরাবির্ভাব— সব ঘটনাই নিখুঁত ভাবে দেখতে পেলাম, জীবন যেন ধন্য হল। সত্যিই, বিস্ময়কর এই দুর্লভ জাগতিক ঘটনা সারা জীবন মনে রাখার মতো। ইচ্ছে করলেই মনে মনে বোগাটার পার্কে সেদিনের ঘটনাগুলো এখনও দেখতে পাই।   

ছবি

বোগাটার পার্কে ফিল্টার লাগানো দূরবীন স্ট্যান্ডে বসিয়ে পুলস্ত্য, পাশে দাঁড়িয়ে আমরা পূর্ণগ্রাস গ্রহণের অপেক্ষায়।
পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময়ে সূর্য যেরকম দেখায়। চারদিকে দেখা যাচ্ছে সৌরমুকুট বা ‘করোনা’, যা অন্য সময়ে সূর্যের ছটায় দেখা যায় না। খালি চোখেই দেখেছিলাম আমরা। ছবিটা ক্যামেরার বিশেষ কায়দায় তুলেছিল ছোটকু।
আংশিক সূর্যগ্রহণের সময়ে গাছতলায় সূর্যের কাস্তে আকৃতির প্রতিচ্ছবি।

 Swati Parrack has done her M. Phil in Sanskrit, Degree and Diploma in German and Hindi languages. She has been associated with Convergence right from its inception and has been teaching German at various levels here.